Skip to main content

Full text of "Chelebelar Dinguli Ed.1st"

See other formats


বাংলাসাহিত্যে সাধারণ ভাবে «সিদ্ধিদাতা 
গণেশ" রবীন্দ্রনাথ £ শিশুসাহিতো বিশেষ ক'রে 
সুকুমার বার । রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের জন্যে 
যেমন জোড়াসাকো! ঠাকুর-বাড়ির ভূমিকা! 
একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্বালয়ের, হুকুমার রায়ের 
সার্থকতার জন্যে উপেন্্রকিশোর রায়চৌধুরী 
ও সমগ্র ভাবে ময়মনসিংক্র রায়-পরিবারের 
ভূমিকাও প্রার তেমনি। কিন্তু এতদিন 
বাংলাদেশে এদের সম্বন্ধে উন্মুখীনত! ও 
চেতনার পরিচয় খুব কমই দেখ! গেছে। 

ছেলেবেলার দিনগুলি" সেই সব-চেয়ে 
উপেক্ষিত দিকে প্রথম সফল উদ্দীপন! ; নতুন 
আবিষ্কারের মতোই নবীনতার প্রোজ্বল। 
এই কাহিনী স্মতিসাহিত্যের ক্ষেত্রে অনন্য, 
'স্মৃতিচিত্রের চেয়ে বড়ো, উপস্ঠাসের মতো 
উত্তেজেক। লিখেছেন পুণ্যলতা চক্রবর্তী, 
ধিনি উপেন্রকিশোরের কন্ঠা, সুকুমার রায়ের 
সঙ্বোদরা। 

প্রচ্ছদপট একেছেন ও অসংখ্য চিত্রে 
অলম্কত করেছেন সত্যজিৎ রায় । 


ছেলেবেলার 
দিনগুলি 


তেভ্ছ তেল তব লাল 


টিক ০ ৪ ভিল 


পুণ্যলত৷ চক্রবর্তী 


প্রণীত 


সত্যজিত রায় 
5, ও সুবোধ দাশগুন্তি 
5৪৭৭ 


এ. কত 4 | 
15511018352, 








অলম্কত 
১ | 
তে 
টে 
টাকা 
৮৪১২৬ %6০৪ 
০১৭ 
নর হল জে 
রি হত) ০ সু ॥ গু 
হি তি শেঠি (২ ু ০ 
রি 1 শী ১৫ 
২ 9 
তো. £হঠ র্ট 
২২$০৮৫৯ 


নি উক্ক্রিপ্ট প্রকাশিত 


. রহ্সোনা 
তোতোমনি জোজোমনি 
বাবুসোনা 


“গল্প বল, দিদ1 1” বলে কাছে বখন আস, 
শুধাই যদি “কোন্‌ গল্প শুনতে ভালব(স 1” 
“তোমার ছেলেবেলার গল্প শুনতে মোরা চাই।” 
এই কথাটা! বারে বারেই তোমর! বল ভাই । 
কবেকার সেকথা রে ভাই-_ আমার ছেলেবেলা ! 
কত দিনের হাসি খেলা আশন্দেরি মেলা, 

কত কালের পুরানো! সে নানারঙের ছবিঃ 
মনের মাঝে উজল হয়ে ফুটে ওঠে সবি ; 

কত শ্রিক্ হারানে! মুখ চোখের 'পরে রাজে : 
সে সব মুখের বাণী যেন আজও কানে বাজে ; 
মধুর স্্তি জড়ানো! সেই সোনার দিনগুলি 
মাল! গেঁথে তোমাদেরি হাতে দিলাম তুলি । 


দিদা 


প্রচ্ছদপট: সত্যজিত্রার 


প্রথম সংক্করণ | আশ্বিন, ১৮৮* শকাব্দ 

প্রকাশক £ হুচরিতা দাশ . 

নিউক্ক্িপ্ট ।১৭২1৩ রাসবিষ্বারী আযাভিনিউ, কলকাতা ২৯ 

পরিচ্ছেদগুলির শীর্যালঙ্করণ ও ১১-পৃষ্ঠার ছবিটি ছাড়া! অন্যান্ত ছবি : সত্যজিৎ রায় 

পরিচ্ছেদগুলির শীর্যালক্করণ ও ১১-পৃষ্ঠার ছবি : হুবোধ দাশগুণ 

মুদ্রক : শশধর চক্রবর্তী । কালিকা! প্রেস প্রাইভেট লিমিটেড ৷ ২৫ ডি. এল. রা স্ট্রীট, কলকাতা 
ব্রক : রিপ্রোডাকশন সিত্িকেট । ৭1১ কর্মওয়ালিশ স্ট্রীট, কলকাতা! ৬ 

প্রচ্ছদপট-মুদ্রক : দি নিউ প্রাইম! প্রেস । ১১ ওয়েলিংটন ক্ষোয়ার, কলকাতা ১৩ 

বাধাই : ঈস্টএও ট্রেডার্স । ২* কেশব সেন স্রীট, কলকাতা ৯ 


দাম : ৩** টাকা 


নিবেদন 


এই বাল্যম্থতির মধ্যে স্থ-সন্বপ্ধভাবে 
পারিবারিক বা সামাজিক জীবনের বিবরণ 
গেবার চেষ্টা করিনি; শ্ৃতির পটে ছবির মত য! 
ফুটে উঠেছিল, গল্পচ্ছলে তাই বলেছি । আমার 
আদরের নাতিরা এই সব গল্প শুনতে খুব 
ভালবাসে, তাদের জন্ই এগুলি খাতায় লিখে 
রেখেছিলাম-_বই করবার উদ্দেশ্য ছিল না। 
তাদের যে জিনিস ভাল লাগে, অন্য ছেলে- 
মেয়েদেরও হ্য়তে! তা” ভাল লাগবে, এই 
বিশ্বাসে প্রকাশ করা হল! আমার হ্রাতুন্পুত্র 
প্রীমান সত্যজিৎই প্রথমে এগুলি প্রকাশ করতে 
উৎসাহ দেন এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এর অধিকাংশ 
ছবি ও প্রচ্ছদপট একে দিয়েছেন । এর 
মধ্যে অনেক পারিবারিক নামের উল্লেখ আছে, 
পাঠকের হ্বিধার অন্য পরিশিষ্টে তাদের 
সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া গেল। | 
ছেলেবেলার দিনগুলির মধুর ম্মৃতি জীবনের 
সন্ধ্যাকালে আমার প্রাণে যেমন আনন দেয়, 
পাঠক-পাঠিকাদের মনেও যদি একটু আনন্দ 

দিতে পারে, তবেই কৃতার্থ বোধ করব। 
১৫ আশ্বিন ১৩৬৫ 


ছেলেবেলার 
দিনগুলি 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





জারী ভি »৮ ৯৩ ২২ ছুরি াাা্্ ৩. 





সস ৫ 
হি __ রঃ নে জুল ৫--- রে পা র্‌ | 
পো 
প্রথম পরিচ্ছেদ 


যে বাড়িতে আমাদের জন্ম হয়েছিল আর শিশুকাল কেটেছিল, 
সেটা ছিল বিরাট একটা সেকেলে ধরনের বাড়ি। তার বাইরের 
ং₹শে আমাদের স্কুল হত, ভিতরের অংশে, দোতলায় আমরা 
থাকতাম আর তিনতলায় আমাদের দাদামশাইরা থাকতেন। 
একতলার বাইরের ঘর, বারান্দা, আর উপরে উঠবার চওড়া কাঠের 
সিঁড়ির সঙ্গেই আমাদের পরিচয় ছিল_-পিছনে আরো কত ঘর 
ছিল, সেখানে কারা থাকত, সেসব ভাল করে মনে নেই। শুধু 
একতলার রান্নাবাড়ির উঠোনের প্রায় আধখানা জুড়ে প্রকাণ্ড 
চৌবাচ্চাটার কথা মনে পড়ে । তা'তে একতলার লোকদের মাছ 
জীয়ানো থাকত, ডাব, পান, শাকের আঁটি ভাসানো থাকত, তার মধ্যে 
নেমে ওরা ডুব দিয়ে স্নান করত। আমাদের দোতলার রান্নাঘরের 
বারান্দা থেকে সব দেখতে পেতাম । অত বড় চৌবাচ্চা আজকাল 
আর কোনে বাড়িতে দেখতে পাই না । 

দোতলার এক সারিতে আমাদের কয়েকখানি ঘর, তার সামনে মস্ত 
চওড়া একট বারান্দা । ঘরের ভিতরকার কতরকম দৃশ্য ছবির মত 
মনে পড়ে । বাবা বেহাল বাজাচ্ছেন» ছবি আকছেন। মা 
সেলাই করছেন, ঘরের কাজকর্ম করছেন । আমরা খেতে বসেছি, মা 
পরিবেশন করছেন । সবাই মিলে শুতে যাচ্ছি কিম্বা কোথাও বেড়াতে 
যাবার জন্য হৈচৈ করে তৈরী হচ্ছি-_কিস্তু ঘরের চেয়ে বারান্দার 


লরি বাইরে, রাস্তার দিকে আরেকটা বারান্দা 
॥ 
তার তিল চািনানিওলিও। 
বলের মত গোল গোল 
হল্দে ফুলে তরে যেত। কিন্ত ভিতরের এই বড় বারান্দাটাই ছিল 
আমাদের আড্ডার জায়গা। খেলাধূলা, পড়াশোনা, গল্পসল্প, বেশীর 
ভীগই এইখানেই হ'ত। জন্মদিন প্রভৃতি উৎসবে এইখানে সারি 
সারি পাত পেতে নিমন্ত্রণ খাওয়া হ'ত। সন্ধ্যাবেলায় মাঝে মাঝে 
অনেক ছেলেমেয়ে জড়ো হয়ে এখানে চ্ছায়া-বাজি” (18219 
[1906917 ও 9108005-0195 ) দেখতাম । রোজ সন্ধ্যায় ছিল 
এখানে বসে গল্প শোনার পালা--কত দেশ-বিদেশের কথা, 
রবাপকথা, রামায়ণ মহাভারতের গল্প, বাবা-মায়ের ছেলেবেলার গন্প, 
হাসির গল্প, হঃখের গল্প, যুদ্ধ ও বিপদের কত রোমাঞ্চকর গল্প । 
শুনতে শুনতে যেন কোন্‌ স্বপ্ন-রাজ্যে চলে যেতাম । গল্পের রাজপুত্র 
যেমন পক্ষিরাজ ঘোড়ায় চড়ে তেপাস্তরের মাঠ পেরিয়ে, সাত-সমুদ্র 
তেরো-নদী পার হয়ে “অচিন দেশের অচিন পুরী'তে চ'লে যায়, 
আমাদের মনও তেমনি সম্ভব-অসম্ভব কত রাজ্যেই না উধাও হয়ে 
বেড়াত। যখন খাবার জন্য ডাক পড়ত, তখন আবার চমকে উঠে 
নিজের রাজ্যে ফিরে আসতাম । 
শোবার ঘরের তাকের উপরে কত খেলনা সাজানো থাকত, কিছু 
কিছু মনে পড়ে। এক জোড়া কৃষ্ণনগরের পুতুল, ভিত্তি আর বুড়ো 
ভিখারী । তাদের হাত পায়ের শিরগুলি, গায়ের প্রত্যেকটি মাংসপেশী, 
মুখের ভাব, চোখের ভুরু পর্যন্ত কি স্বন্দর নিখু'তভাবে তৈরী । একটা 
চূড়োওয়ালা রঙ্গীন গালার কৌটোর মধ্যে গালার তৈরী এলাচ-লবঙ্গ- 
সুপুরী- বন্ধুদের ঠকিয়ে মজা দেখতাম । একটা হাসের ডিম, তার 
ভিতরে একটা রঙ্গীন ডিম, তার ভিতরে আরেকটা ডোরাকাটা ডিম, 


হতে মুস্্র ডালের মত একটা ছোট্ট লাল দানাতে গিয়ে শেষ হত। 
মায়ের একটা সুন্দর বাক্স ছিল, সেটা খুললেই আমর! চারদিক 
থেকে ঝুঁকে পড়তাম। বাঝ্সটার গায়ে অনেক কারিকুরি করা, 'ডালার 
ভিতরে আয়না বসানো, আর নানারকম খোপ. কাটা । সেইসব 
খোপে খোপে কত আশ্চর্য আশ্চর্য জিনিস। লেসের মত ফুরফুরে 
জালি-কাটা হাতির ফ্রাতের পাখা, বিহ্ুকের (200679£ 01 70981] ) 
তৈরী ছোট্ট ব্যাগ, তার মধ্যে কত দেশ-বিদেশের কতকালের পুরানে! 









||| 


| 


| 
1 


..*ফিরে এসে ডিও 
দেখেন খাত রি 
আমি একমনে | 4422 1 
টা 


অদ্ভুত সব.টাকা পয়সা । মিনা করা, তারের কাজ করা, চন্দন কাঠের 
খোদাই করা, টুকিটাকি কত ম্বন্দর শুন্বর জিনিস আমাদের কাছে 
সে-সব যেন গুপ্তরত্বের ভাণ্ডার ব'লে মনে হত । 

বাবার ঘরের কোণে স্ৃম্দর একটি মেয়ের মুতি ছিল, সেটি বাবার 
ভারি যত্বের জিনিস। বাবার একজন বন্ধু (রোহিণীকান্ত নাগ) 
চমৎকার মুর্তি গড়তে পারতেন। অন্ন বয়সে তিনি ইটালীতে মারা 
মান। বিলাত যাবার আগে এই মেয়ের মুরতিটি তৈরী করে তিনি 


১০ 


বাবাকে উপহার দিয়ে যান। আমি একদিন সেই মেয়েকে আদর 
করে বেল খাওয়াতে গিয়েছিলাম-_ধব্ধবে সাদা মুখখানিতে সেই 
যে.বেলের কষ লেগে গেল, কত ধুয়েও আর ভাল করে ওঠানো 
গেল না। | 
আরেকদিন, বাব! ছবি আঁকতে জাকতে একটু ঘরের বাইরে 
গিয়েছেন__ঈজেলের উপরে অসম্পূর্ণ ছবি আর তার পাশেই রঙ্গের 
তুলি প্যালেট্‌ ইত্যাদি রয়েছে। ফিরে এসে দেখেন আমি একমনে 
ছবি জাকছি! সে ছবি ঠিক করে নিতে বাবাকে অনেক পরিশ্রম 
করতে হয়েছিল | 

দিদিমা কবে যে বিলাতে গিয়েছিলেন সে-কথা মনে নেই, 
কিন্তু তার ফিরবার দিনটি বেশ মনে পড়ে। বাড়িতে ঢুকেই দিদিমা 
দু'হাত বাড়িয়ে জংলুমামাকে কোলে নিতে গেলেন । ছোট্ট এক বছরের 
জংলুমামাকে তার মায়ের কাছে রেখে দিদিম! বিলাতে চলে গিয়েছিলেন, 
এখন সে-ছেলে মাকে চিনতে পারছে না। শক্ত ক'রে ওর দিদিমার 
গল! আকড়ে রইল-_কিছুতেই মায়ের কোলে গেল না ! 

তখনকার দিনে তে৷ বেশী লোকে বিলাত যেত নাঃ মেয়েরা তো 
খুবই কম যেতেন । তার উপরে দিদিমা আমাদের দেশের মেয়েদের 
মধ্যে প্রথম বি, এ. পাশ করেন এবং মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি 
পাশ ক'রে বিলাত যান। বিলাত থেকে উপাধি নিয়ে তিনি যখন 
দেশে ফিরলেন তখন দেশের লোক খুব আনন্দ আর গৌরব বোধ 
করলেন এবং আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে বাড়িতে বেশ একটা 
উৎসবের সাড়া প'ড়ে গেল। আমাদেরও আনন্দের সীম৷ রইল না, 
সুন্দর সুন্দর খেলনা, পুতুল, ছবির বই ইত্যাদি উপহার পেয়ে । ছোট 
বড় সকলের জন্যই দিদিম] কিছু-না-কিছু উপহার এনেছিলেন । 

দিদিমা বিলাত থেকে ফিরলেন, নতুন কায়দায় তার ড্ইং-রুম 


সাজানো হ'ল। দেশ-বিদেশ থেকে আনা কত রকম সুন্দর সুজ্দর 
জিনিস! আমরা সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে, আস্তে আন্তে সে-সব নেড়ে 
চেড়ে দেখতাম। দাদামশাইর ঘরের কোণে তাঁর লাঠিগুলে! 
সাজানো থাকত। একটা ছিল বুল্ডগমুখো৷ মোটা লাঠি, হল্দে কাচের 
চোখওয়াল! বুল্ডগ টা দাত খি'চিয়ে রয়েছে । আরেকটা ছিল দারচিনি 
ডালের তৈরী লাঠি, সেটা কামড়ালেই দারচিনির স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া 
যেত। আমাদের দাত ব'সে বস সেটা একেবারে বাদাম খোলার মত 
এবড়ো-থেবড়ো৷ হয়ে গিয়েছিল । আর তার সেই পিঠ চুলকোবার 
ডাণ্ডাটা! কচি ছেলের হাতের মত ছোট সুন্দর সাদা হাতির 
দীতের তৈরী একটা হাত, ঘরে ঢুকলেই সেটা দিয়ে একবার 
পিঠ চুলকে নিতাম। | 

বাড়িতে কয়েকটা ঘর ছিল যাতে আমরা ছোটরা ঢুকতাম না। 
গল্পে যেমন শোনা যায় বিশাল রাজপুরীর কোনো৷ একটা ঘর তালাবদ্ধ, 
তার ভিতরে কি আছে কেউ জানে না, তেমনি এই ঘরগুলোর মধ্যে কি 
আছে ভাল ক'রে জানতাম না বলেই মনের মধ্যে কেমন একট! ভয় 
মেশানো৷ কৌতৃহল থাকত । একটাকে আমরা বলতাম “কঙ্কালের ঘর' ; 
তার দেওয়ালে আন্ত একটা মানুষের কন্কাল ঝুলত, আলমারীতে মোট। 
মোট! বই, তাকের উপর সারি সারি শিশিবোতল আর কি-সব যন্ত্রপাতি । 
আসলে এটা ছিল আমাদের ডাক্তার দিদিমার পড়াশোনার ঘর । 
আরেকটা ছিল “অন্ধকার ঘর'ঃ তার চারিদিক বন্ধ। ভিতরে লাল 
কাচের ঝাপস! ভূতুড়ে আলোয় আবছায়! দেখা যেত, বড় বড় সাদ! 
চৌকোন! ডিশ, আরো অনেক শিশিবোতল ও যন্ত্রপাতি । এটা ছিল 
ফটোগ্রাফির “ডার্ক-রুম” । আমরা চৌকাঠ থেকে উ'কি মেরে এ-সব 
দেখতাম, ভিতরে ঢুকতাম না । 

বড়দিদিমার (মার পিসিম! ) ঘরে ঢোকাও আমাদের বারণ 


ছিল। সেখানে কিস্তু ভয়ের কিছুই ছিল না বরং লোভের অনেক কিছু 
ছিল। পাছে আমরা জুতো পায়ে কিংবা নোংর! হাতে বড়দিদিমার 
পুজোর জিনিসপত্র নষ্ট ক'রে ফেলি সেই জন্য তিনি না ডাকলে তার 
ঘরে ঢোকা মানা । বড়দিদিমা যখন পুজোয় বদতেন, তখন আমি আর 
আমার প্রিয় সাথী চামি-মাসী রোজ দরজার গোড়ায় ব'সে দেখতাম । 
গঙ্গামাটি দিয়ে শিব গড়া, মন্ত্র পড়া, ঘণ্টা নাড়া, ফুল-চন্দন-বেলপাতা 
দেওয়া, কোশাকুশী ক'রে গঙ্গাজল ঢালা, সবই চমৎকার লাগত, কিন্ত 
যেই বড়দিদিম৷ ববম্‌ বম্‌ ক'রে গাল বাজাতেন, অমনি ভয়ানক হাসি 
পেত! মা বলেছিলেন হাসতে নেই, তাই ছু'জনে ছুটে লম্বা বারান্দার 
অন্যদিকে পালিয়ে গিয়ে বেশ একচোট হেসে নিয়ে আবার শান্ত হয়ে 
বসতাম। স্নান ক'রে পুজো সেরে, বড়দিদিমা খেতে বসতেন । আমরা 
ছু'জনে প্রসাদ পেতাম । পাথরের বাটিতে ঘনছুধ ও কলা দিয়ে ভাত 
মাথতেন, পায়েসের মত খেতে সেই সুগন্ধি চালের ছুধভাতের উপর 
আমাদের ভারি লোভ ছিল। আর লোভ ছিল আমসত্বের ! 
বড়দিদিমা প্রতিবংসর কাশী থেকে ক্যানেস্তারা ভি আমসত্ব তৈরী 
ক'রে আনতেন । বড় বড় থালার মত গোল আমসত্ব, চাটাইয়ের মত 
দাগকাটা চৌকোনা আমসত্ব, সুন্দর ছাচে ঢালা ফুলকাটা আমসত্ব। 
আমাদের সবাইকে ভাগ ক'রে দিতেন । 

বভ়দিদিমার জন্য “ভারী” রোজ গঙ্গাজল দিয়ে যেত। কাধের উপর 
বাশের ভারে ছুইদিকে ছুই কলমসী ঝুলিয়ে ঝুঁটি-বাধা লোকটা! যেই 
আসত, অমনি আমরা ছুটে যেতাম । জলে কত কুটো৷ কাটা ভাসে তাই 
কাপড়ে ছেঁকে নেওয়। হ'ত, তার সঙ্গে ক্ষুদে ক্ষুদে কাকড়ার ছান! বেরোত 
-_আমরা সেগুলোকে নিয়ে গামলায় জল দিয়ে পুষতাম । একটু বড় 
হলেই কিস্তু তারা গামলার কান! বেয়ে উঠে কে কোথায় পালিয়ে যেত । 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 


তখন আমরা পাঁচ ভাইবোন। দিদি ( স্বখলতা, ডাকনাম 
হাসি) সবার বড়, আর খুব শাস্তশিষ্ট । ছেলেবেলায়ও দিদিকে 
কখনও চেঁচামেচি করতে কিন্বা হুড়োহুড়ি করে খেলতে দেখেছি বলে 
মনে পড়ে না। শুনেছি ছোটবেলায় নাকি দিদির খুব অসুখ 
করেছিল। হাঁটতে. এবং কথা বলতে শিখেও অস্থখের জন্য ভুলে 
গিয়েছিল, আবার দাদার সঙ্গে সঙ্গে শিখতে আরম্ভ করল। 
মেইজন্যেই বোধ হয় দিদির মধ্যে কেমন যেন একটু ভীরু করুণ ভাব 
ছিল। তারপরে দাদা আবার তেমনি চঞ্চল আর স্ফুতিবাজ। সব 
কিছুতেই দাদার উৎসাহ, খেলাধুলায় সে-ই আমাদের পাণ্ডা । ছোট্ট- 
বেল! থেকেই না কি দাদা খুব চঞ্চল ছিল। তার কলের খেলনা- 
গুলো সে ঠুকে ঠুকে ভেঙ্গে দেখত কি করে চলে। বাজনাগুলো ভেঙ্গে 
দেখবার চেষ্টা করত কোথা থেকে আওয়াজ বেরোয় । ছোট্ট লাঠি হাতে 
বোডিংয়ের মেয়েদের ছাতময় তাড়া করে বেড়াত। প্রকাণ্ড তিনতলার 
ছাতের একদিকে পগাঁচিলটা খুব উ*চু ছিল, তার মধ্যে খানিক উ চুতে 
একটা গোল ফুটো ছিল। দাদা একবার নাকি সে ফুটো দিয়ে গলে 
বাইরের কানিসে নামবার চেষ্টা করেছিল-__শুধু ছোট্ট একখানি ভুতো- 
পরা পা ভিতর দিকে ছিল। হঠাৎ আমাদের বড়মামা দেখতৈ পেয়ে 
দৌড়ে গিয়ে পা-টা ধরে ফেলে চিৎকার করে সবাইকে ডাকলেন । 


ন্‌ 


দাদার পরে আমি । আমিও খুব চঞ্চল ছিলাম। আমার মাথার 
চুল কেন জানি না, অনেকদিন পর্যস্ত ছেলেদের মত ছোট করে কাটা 
ছিল। আমার পরে মণি ( স্ুবিনয় ) ছিল ধবধবে ফস, নীল চোখ, 
মাথাভরা চুল-_ আমার চেয়ে তাকেই বেশী মেয়ের মত দেখাত। 
খেলার মধ্যে অনেক সময় মণিকে আমার ফ্রক ও হার বালা পরিয়ে, 
চুলে রিবন বেঁধে, মেয়ে সাজিয়ে দিতাম । তার পরে টুনী (শাস্তিলতা ) 
ছিল ভলপুভুলের মত ফুটফুটে সুন্দর__তাকে যে দেখত সেই আদর 
করত । 


৬ শি ওটি / 
ডু রি ১ ৫/% 
স্পট ৮, 
০2৮ 


৮২" 3 (২৩ 
ঃ ্ 
১২২৪ ২২২৩ 


১০১২২ 





''ছোট লাঠি হাতে বোডিংয়ের মেয়েদের ছাতময় তাড়া করে বেড়াত... 

টুনীর পরে আমাদের একটি বোন জন্মিয়ে অল্প পরেই মারা 
যায়। “ছোট্ট বোনটি এসেই আবার চলে গেল কেন?” আমরা 
নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে স্থির করলাম, “আমরা তো একটি করে 
বোন একটি করে ভাই, টুনীর পরে তাহলে এবার ভাই আসবার পালা! 
-__-ভগবান নিশ্চয় ভুল করে ভাইয়ের বদলে বোন পাঠিয়ে ছিলেন, 
তাই তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে নিলেন।” কিছুকাল পরে যখন ছোটভাই 
'নান্কুর উম্ম হল, তখন আমর! খুশী আর নিশ্চিন্ত হলাম যে, এবারে 
আর ভগবানের হিসাবে ভুল হয়নি । 


আমরা কয়টি ভাইবোন, আর 'স্ুরমামাসী-মাসী হলেও কিন্ত 
দিদির চেয়ে মোটে ছু বৎসরের বড়, সুতরাং ছোটদের দলে । 
ছোটদের মধ্যে সব চেয়ে বড় তো ! মাসী আমাদের খুব ভালবাসত, 
আমাদের কত আব্দার উৎপাতও সহা করত । একবার দাদা খেলতে 
খেলতে সুরমামাসীর মুখে এক ব্যাটের বাড়ি লাগিয়ে দিল। মাসীর 
ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে, চোখ দিয়ে জল পড়ছে । কিন্তু যেই বাবা 
দাদাকে শাসন করতে গেলেন অমন হাত তুলে মানা! করল “বেশী 
লাগেনি! বেশী লাগেনি !” স্ুরমামাসীর ছোট্টবেলায় ওর মা মারা 
গিয়েছিলেন, বাবা সন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন । তিনি মাঝে মাঝে 
কলকাতায় এলেই আমাদের বাড়িতে আসতেন। প্রকাণ্ড দাড়ি, 
মাথায় লম্বা লম্বা পাকানো পাকানো লাল জটা, গলায় হাতে রুদ্রাক্ষের 
মালা-__দেখলেই কিরকম ভয় হত। তিনি কিন্তু আমাদের কাছে 
টেনে নিতেন, হাসিঠাট্রা করতেন, আর গল্প বলতেন। কত দেশ 
ঘুরেছেন__আসামে, তিববতে, হিমালয়ের কত ছুর্গম জায়গায় পায়ে 
হেঁটে গিয়েছেন, কত আশ্চর্য দৃশ্য দেখেছেন, কত বিপদের মুখে 
অদ্ভুতভাবে রক্ষা পেয়েছেন, নানারকম লোকের সঙ্জে দেখা? কত 
মজার মজার ঘটনা । আমরা ই! করে 'সে সব শুনতাম । 

আমরা কটি ভাইবোন আর আমাদের প্রায় সমবয়সী মামা 
মাসীরা একসঙ্গে খেলাধুলা আর লেখাপড়া করতাম । বিকালে 
ছাতে-উঠলে, বোড্ডিংয়ের ছোট ছোট মেয়েরাও খেলার সাথী জুটত, 
প্রকাণ্ড ছাতে খেলাটা জমত বেশ ভালই । লুকোচুরি, চোর-চোর, 
কুমীর-কুমীর, কানামাছি, এসব খেলা তো ছিলই, তাছাড়া মন থেকে 
বানিয়ে কতরকম খেলা হত- নতুন নতুন খেলার কল্পনা দাদার 
মাথায় খুব আসত । | 

খেলতে খেলতে মাঝে মাঝে ছুর্ঘটনাও ঘটে যেত__-বড় ছাতের 


খানিকটা জায়গায় পীচিল খুব নীচু ছিল বলে, সেদিকে আমার্দের যাওয়া 
বারণ ছিল। একদিন একটা টিয়াপাখী উড়ে এসে যেই না৷ সেই গ্যাড়া 
ছাতে বসেছে, অমনি আমরা নিষেধ ভুলে সেইদিকে ছুটেছি; তিন 
বছরের ট্ুনী, “তিয়াপাকি ! “তিয়াপাকি !' বলে নাচতে নাচতে 
হঠাৎ সেই দোতলার ছাত থেকে একতলার ছাতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে 
গেল ! মা ছুটে এসে তাকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে গেলেন__জল 
গেল। অনেকক্ষণ পরে জ্ঞান হয়ে চোখ মেলেই ট্নী ঠোটে হাত 
দিয়ে ফিস্ফিস্‌ করে জিজ্ঞাসা করল “আমাল মুকে কি? বেচারার 
নাক-মুখ ভীষণ কেটে ফুলে গিয়েছিল । 

আরেকদিন টুনী এক কাণ্ড করেছিল । দে কোথা থেকে একটা 
ব্যাগ হাতে করে ডাক্তার সেজেছে । জংলুমামা উপুড় হয়ে শুযেছিল, 
তার কাছে গিয়ে বলছে “ইস্‌! তোমার পিঠে ম-স্ত-ব-ড় ফোড়া !' 
বলেই, একটা ছুরি বার করে ধ্যা-চ করে ফোড়া কেটে দিয়েছে। 
ভাগ্যে ছুরিটা উপ্টো করে ধরেছিল! ভোঁতা দিকটা বসিয়েছিল, 
তবু একেবারে কাধ থেকে কোমর অবধি বেশ গভীর একটা আচড় 
কেটে ফেলেছিল । 

একদিন রাত্রে আমরা ঘরে বসে আছি, হঠাৎ বারান্দাটা খুব 
আলো হয়ে উঠলো । বেরিয়ে দেখি, বারান্দায় লণ্ঠনটা কাত হয়ে 
দাউ দাউ করে জ্বলছে আর চামিমাসী ছুটোছুটি' করছে-_তার কাপড়েও 
আগুন। আলো নিয়ে খেলা করতে করতে কি করে যেন সেটা 
উল্টিয়ে আগুন ধরে গিয়েছে । ভয়ে সে চেঁচাতেও পারছে না--শুধু 
ছুটছে। মুন্দরকাকা ছুটে গিয়ে তার জামা ছিড়ে ফেলে দিলেন, 
থাবড়িয়ে আগুন নিভিয়ে দিলেন, তাই সে বেঁচে গেল। কাকার 
হাতে কিন্তু বড় বড় ফোস্ক৷ পড়ে গেল। 


আরেকদিন বাড়ি মেরামত করবার জন্ত চুন বালি সুরকি এনে 
উঠোনে গাদা! কর! হয়েছে, আমরা সেগুলোকে পাহাড় কল্পনা করে 
লাফালাফি খেলছি। চুণের গাদাটা হয়েছে বরফঢাকা হিমালয় পর্বত। 
হঠাৎ ভুলুমামা একলাফে হিমালয় ডিঙ্গোতে গিয়ে ঘ-পা-ৎ করে 
একেবারে চুণের গাদার মধ্যে তলিয়ে গেল। যখন তাকে বার করা 
হল, তখন তার মাথা থেকে পা! পর্যস্ত সাদা, নাকে মুখে চোখে চুণ 
ঢুকেছে, চেঁচাতে পারছে না, শুধু চোখমুখ বুজে গে গোঁ করছে। 
তখলই চৌবাচ্চায় চুবিয়ে তাকে ধোওয়া হল। 

আরেকট! হুর্ঘটনার কথা মনে করলেই হাসি পায়। একদিন 


[] ৯ 
টি 





*"ভুলুমাম! এক লাফে হিমালয় ডিডোতে গিয়ে ঘ-পা-ৎ-* 
আমর! বারান্দায় বসে আছি, দেখলাম বড় মা ( দিদিমার মা ) এক 
হাড়ি দই নিয়ে তার ঘরে ঢুকলেন। দইটা ঘরে রেখে, দরজায় শিকলি 
তুলে দিয়ে চলে গেলেন। মংলুমাম!৷ ছিল পেটুক মানুষ ; কতক্ষণে 
খাবার সময় হবে, আর তার সবুর সইছে না । একটু নিরিবিলি হতেই, 
তাড়াতাড়ি একটা টুলে চড়ে শিকলি খুলে, চুপি চুপি খাটের তল! 
থেকে হাড়িটা টেনে নিয়ে মস্ত এক খাবল দই মুখে পুরে দিয়েই 


১৭ 


ধাপরে লে কি বিষম চীৎকার! আসলে, সেটা দই ছিল নাছিল 
খানে খাবার টুপ! পানে টুশ বেখী হলে কি রকম মুখ পুড়ে ঘায় জান 
জো? নঙুন'চুনের আবার খাজ খুব বেশী হয়, তারই এফ খাবল মুখে 
দিলে কি দশা হয় বুঝতেই পারো । বেচারার দই খাওয়া তো দূরের 
কথ! ক'দিন কিছুই প্রায় খেতে পারল না, তার উপরে চুরি করে খেতে 
গিয়ে ধর| পড়ার লঙ্জ। ৷ 

মংলুমামার আরেকটা মজার কাণ্ড মনে পড়ছে। একদিন 
মংলুমাম৷ একটা গেলাসে জল দিয়ে, তার মধ্যে ছোট্ট একটা জ্যাস্ত 
মাছ নিয়ে চলেছে পুষবে বলে । সামনে ছোটকাকাকে দেখেই আবদার 
ধরল, “গল্প বলো ।” ছোটকাকা চমৎকার গল্প বলতে পারতেন, রোজ 
সন্ধ্যার সময় কত ভাল ভাল বই থেকে আমাদের সুন্দর সুন্দর গল্প 
শোনাতেন। তিনি তামাসা করে বললেন, “এ মাছটা যদি খেতে 
পারিস তাহলে গল্প বলব।” ওমা! যেই না বলা, অমনি মংলুমামা 
একগাল জল নিয়ে সেই জ্যান্ত মাছটাকে কৌৎ করে গিলে ফেলল । 

ছোটবেল! থেকেই দাদাও চমৎকার গল্প বলতে পারত। 
বাবার প্রকাণ্ড একটা বই থেকে নানা জীবজস্তর ছবি দেখিয়ে টুনী 
মনি আর আমাকে অনেক আশ্চর্য আর মজার গল্প বলত । বইয়ের 
গল্প ছাড়াও নিজের মনগড়া কত অদ্ভুত জীবের গল্প- মোটা 
“ভবন্দোলা' কেমন ছুলেছলে থপথপিয়ে চলে, “মস্ত পাইন' তার 
সরু লম্বা গলাটা কেমন পেঁচিয়ে গিট পাকিয়ে রাখে, গোলমুখো 
বাছুড়ের মত বুলে থাকে। এখন যেমন তোমরা “কুমড়োপটাজ্' 
'রামগরুড়, “হ'কোমুখে হাংলা'_এদের গল্প শুনে আমোদ পাও, 
আমরাও তখন এ সব অদ্ভুত জীবের গল্প শুনে আমোদ পেতাম । 

মজার অভিনয় করতেও দাদা খুব ভালবাসতো । ছোটদের জন্য 


৯২ 


লেখা যৃত মজার কবিতা কাগজে বেরোত, দাদা সব মুখস্থ করে 
ফেলত । টুনি মণি. তখন নেহাৎ ছোট ছিল). আমাকেই দাদা সেই 
কবিতা শিখিয়ে দিত). বিকালে যখন ছাতে অনেক লোক: জমা 
হত, তখন ছুজনে “ইছুর ভায়া 'নাপতে-ভায়া' 'গণেশবাধু ইত্যাদি 
মজার কবিতা বিচিত্র মুখভঙ্গীর সঙ্গে অভিনয় করে সবাইকে হাসাতাম । 
কত রকম মুখভঙ্গীই যে দাদা করতে পারত ! হাসিমুখ, কান্না মুখ, 
রাগ মুখ, ভয় মুখ, হ্যাক! মুখ, বোকা মুখ, অদ্ভুত বিকট মুখ । দেখে 
সবাই'হেসে কুটিপাটি হত আর অবাক হ'ত যে অমন সুন্দর মুখখানিকে 
কি করে এমন অদ্ভুত হাস্যকর ভাবে বিকৃত করতে পারে । 

প্রকাণ্ড ছাতটা যে শুধু আমাদের খেলার মাঠ ছিল তা নয়, 
ঘোড়ারও চরবার মাঠ ছিল সেটা । দিদিমা একবার নেপালের রাজ- 
মাতাকে চিকিৎসা করে মরণাপন্ন অবস্থা থেকে বাঁচিয়েছিলেন। তারা 
খুশী হয়ে নিদিষ্ট টাকার উপরেও আরো অনেক দামী দামী উপহার 
দিলেন। কত হীরে সোনার গহনা, রূপোর বাসন, ভাল ভাল পোশাক, 
মুগনাভি, পিতল তামা ও হাতির দাতের তৈরী কি সুন্দর স্বন্দর জিনিস, 
আর সুন্দর বেঁটে গোলগোল সাদা একটি নেপালী টাট্টু, ঘোড়া ! 
পাহাড়ী ঘোড়া, কলকাতা শহরে বেচারা পাহাড় কোথায় পাবে; 
সন্ধ্যাবেলায় আমাদের খেলাধুল! হয়ে গেলে, সহিস তাকে ছাতে নিয়ে 
যেত! দিব্যি খু্খুটু করে সি'ড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে, সে ছাতে 
বেড়াত । | 

তা ছাড়া, কত যে নিমন্ত্রণ খাওয়া হত এ ছাতে! পাড়ার যত 
বিয়েবাড়ির খাওয়া, প্রায় সবই ওখানে হত । বছরের মধ্যে আমাদের 
একটা খুব আনন্দের দিন ছিল “বালক-বালিকা সম্মিলন' । সামনেই 
আমাদের ব্রাহ্ম-সমাজ মন্দির । মাঘোৎসবের সময় ছোটদের উৎসবের 
দিনে, মন্দিরে উপাসনার পরে আমরা কয়েক শ' ছেলেমেয়ে রাস্তা পার 


১৩ 


হয়ে এসে এই ছাতে সারি সারি পাত পেড়ে নিমন্ত্রণ খেতে বসতাম। 
হাঁসিগল্প আনন্দ কোলাহলের মধ্যে আমাদের উৎসব শেষ হত। তারি 
মধ্যে মনে পড়ে, নীলচোখ সোনালী চুল, ধুতিপরা একটি সাহেব 
আমাদের মাঝখানে বসে হু'হাতে লুচি ছিড়ে খাচ্ছেন আর সকলের 
দিকে চেয়ে হাসছেন । সুদুর নরওয়ে দেশ থেকে এসেছেন, বাংলা 
তো জানেনই না, ইংরাজীও ভাল জানেন না। হাসি দিয়েই সকলের 
সঙ্গে ভাব করে নিচ্ছেন । 

কিছুদিন পরে হঠাৎ শুনলাম, সাহেব কি অসুখ হয়ে মারা 
গিয়েছেন । আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে তাকে যখন নিয়ে গেল, 
আমর! বারান্দায় দাড়িয়ে দেখলাম । ম্ুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে 
গান গাইতে গাইতে অনেক লোক মিলে তাকে শশ্মানে নিয়ে চলেছে 
_তার বাঁকড়া লোমওয়ালা পৌষা কুকুরটাও সঙ্গে চলেছে । সবাই 
সাহেবের জন্য ছুঃখ করছিল, আমা্ররঞ্কিস্ত সাহেবের চেয়েও কুকৃরটার 
জন্যই বোধ হয় বেশী ছুঃখ হচ্ছিল । 


১৪ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





তৃতীয় '্রিচ্ছেদ 


দাদাদিদিরা যখন স্কুলে যেতো, আমিও সঙ্গে যাবার জন্য আব্বার 
করতাম । পাঁচ বৎসর বয়সে আমিও স্কুলে ভতি হলাম । বাড়ির 
মধ্যেই স্কুল। বেশ মজা, এ দরজা দিয়ে বেরিয়ে ও দরজা দিয়ে 
ঢুকলেই হল। প্রকাণ্ড বড় উঠোন, তার তিনদিক ঘিরে লম্বা লম্বা 
ঘর আর বড় বড় থামওয়ালা বারান্দা। অন্যদিকে পুজোর দালান । 
একতলায় স্কুল, দোতলায় বোচু্ছিল । ছোটদের ক্লাশ হত পুজোর 
দালানে । তার থাম ও খিলানের মাথায়, কানিসের নীচে, সুন্দর 
লতাপাতা খোদাই করা । সাদা-কালো মার্বল পাথরের মেজের উপর 
জানালার রঙ্গীন কাচের মধ্যে দিয়ে রামধন্ুর মত রঙ্গীন আলো এসে 
পড়ত, ভারি ভাল লাগত আমার এই ঘরটি । 

এখন ছোটদের পড়বার জন্য কত সুন্দর স্বন্দর ছবিওয়ালা বই 
হয়েছে, আমাদের সময়ে এত সব ছিল না। অধিকাংশ বইয়ের ছবিও 
ভাল নয়, ভাষাও শক্ত কটমট ছিল। ছুয়েকজন শিক্ষয়িত্রী বেশ 
সন্দর গল্পের মত করে সব বুঝিয়ে দিতেন, তাদের ক্লাস খুব ভাল 
লাগত । একজন মাস্টারমশাই ছিলেন ভয়ানক রাগী । যতই মজার 
কথা হ'ক না কেন, একটু যদি হেসে ফেলেছি, অমনি এক ধমক 
দিতেন। বইয়ে ছিল “ময়ুরের কেকারব”। মাস্টারমশাই ক্লাসের 
একজন ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ময়ূর কিরকম করে ডাকে ?” 


১৫ 


ছেলেটি মযুরের ডাকের চমৎকার নকল করল। ক্ষুনি মাস্টারমশাই 
তাকে দাড় করিয়ে দিলেন_-“অত জোরে ডাকলে ক্যান? এই 
মাস্টারমশাই “দাঁড়া” বলতে পারতেন না, বলতেন প্দারা”। 
আমরাও যখন স্কুল-স্থুল খেল! করতাম তখন মাস্টার সেজে খেলার 
ছলে ছাত্রদের শাসন করে বলতাম-_“দার! ! দার ! দারাইয়া থাক্‌ !” 
উপরের ক্লাসে কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষয়িত্রী ছিলেন, যাঁরা খুব ভাল 
পড়াতেন । একটু বড় হয়ে যখন তাদের হাতে পড়লাম, তখন থেকে 
পড়াশুন৷ সত্যিই ভাল লাগল । একজন শিক্ষয়িত্রী ছিলেন যেমন ফস? 
ও লম্বা-চওড়া, তেমনি কড়া ছিল তার শাসন। কট্‌্মটু করে যার 
দিকে তাকাতেন তার মুখ শুকিয়ে যেত, বুক ছুরছ্বুর করত। ছুষ্ট 
ছেলেমেয়েরা তে৷ তাকে যমের মত ভয় করত । কিন্তু গল্প বলতে 
যখন বসতেন,তখন তিনি যেন একেবারে অন্য মানুষ ! “নীতি-শিক্ষা”্র 
ক্লাসে কি স্বন্দর করে যে নানা গল্প কবিতা আর জীবন চরিতের মধ্যে 
দিয়ে আমাদের নীতিকথ৷ শোনাতেন, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম_ ক্লাস. 
করছি বলে মনেই হ'ত না। 

গানের ক্লাসটাও বেশ ভাল লাগত । কতরকম অন্দর সুন্দর গান, 
প্রার্থনার গান,ঃখেলা ও অভিনয়ের গান, হাসির গান,এখনও তার কিছু- 
কিছু মনে আছে ।. একটি ছেলে সুন্দর গান করত, কিন্তু গাইধার সময় 
এমন অদ্ভুত মুখ করে মাথা নাড়ত যে, ক্লাসমুদ্ধ ছেলেমেয়ে হো-হো 
করে হেসে উঠত । গানের টিচার তাকে সামনে নিয়ে, আমাদের দিকে 
পিছন ফিরিয়ে তার মুখোমুখি করে বসালেন । যেই মুখ বেঁকায় 
অমনি ইশারা করে তাকে সাবধান করে দেন। এমনি করে তার 
সে মুখ বেঁকান অভ্যাস সেরে গেল। 

স্কুলবাড়িতে বাগান কিংবা মাঠ ছিল না, প্রকাণ্ড উঠোনেই 
আমাদের খেলা হ'ত। মাঝে মাঝে একজন মেম-সাহেব এসে নানা- 


১৬ 


রকম খেলা শিখিয়ে যেতেন। খেলার লক্ষে সু করে কি সব ইংরাজী 
ছড়া ছি--(38115 98115 ৪560৮ প0জ 0াত 6107550 
6016 2089019% ইত্যাদি), সেসব খেলা বেশ ভালই লাগত । কিন্ত 
(বিশেষ করে ছেলেদের ) বেশী ভাল লাগত । বারো বছর অবধি 
ছেলেদেরও স্কুলে নেওয়া হত, স্বতরাং অধিকাংশ মেয়েদের 
ভাইরাও এ স্কুলেই পড়ত। যে সব মেয়েরা হুড়োহুড়ি ভালবাসত 
না, তারা বসে বসে পুতুল থেলত । একদল হুষ্ট, ছেলে ডাকাত 
সেজে তাদের সব জিনিস লুটপাট করে নিত। ওরা শুধু 
হাউমাউ করে কাদতো, আমরা কয়েকজন “্দস্তি মেয়ে” গিয়ে 
ডাকাতের হাত থেকে ওদের রক্ষা করতাম । এছাড়া “ক্ষিপিং,” প্টাগ্‌ 
অফ. ওয়ার”, হাই জাম্প”, “লং জাম্প”, এসব তো হু'তই। 
একজন খুব লম্বা ছেলে অসম্ভব রকম লাফাতে পারত। ক্যাঙ্গার 
দেখবে ?” বলে সেছুই হাটু মুড়ে, হাত ছুটোকে বুকের কাছে গুটিয়ে, 
গল লম্বা করে, মুখটাকে বাড়িয়ে দিয়ে, হু-স্‌ করে এমন প্রচণ্ড লাফ 
দিত যে, সবাই অবাক হয়ে যেত। এ ছেলেটি কে জানো ?বড় হয়ে 
ইনিই হয়েছিলেন প্রসিদ্ধ দেশনেতা দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগ্প্ত। 

টিফিনের ছুটির সময় বারান্দার কোণে কৈলাস ময়রা প্রকাণ্ড 
একটা বারকোশের উপর ঝকৃঝকে কীসার বড় বড় জামবাটিতে ভরা 
নানারকম খাবার নিয়ে তার দোকান সাজিয়ে বসত। আজকাল 
তোমর! ছ' আনা দিয়ে ছোটখাটো একটা সন্দেশ কিংবা! রসগোল্লা পাও, 
তখন ছু আনাতে একটি ছেলের বেশ ভালরকম জলখাবার হয়ে যেত। 
চার পয়সায় চারখানি লুচি আর পরিমাণ মত ডাল কিংবা তরকারি 
(কিংবা সিঙ্গাড়া বা কচুরি যা চাও ), আর ছু' পয়সা করে ছুটি" সন্দেশ 
বা অন্ত মিটি । 


১৭ 
খ& 


স্কুলের প্রাইিজের দিনটি ছিল ভারি আনন্দের । কতদিন আগে 
থেকে তার জন্য উদ্ভোগ আয়োজন চলত | গান শেখানো, আবৃত্তি ও 
অভিনয় শেখানো, কেমন করে মেম-সাঁহেবের হাত থেকে প্রাইজ নিতে 
হয়, তাও শেখানো! । লাট সাহেবের সামনে আদবকায়দাছুরত্ত হওয়া 
চাই তো? তাই আমাদের আগে থেকে সব কায়দা-কান্নন শিখিয়ে 
দেওয়া হ'ত। একজন টিচার চেয়ারে বসতেন, আমরা তার সামনে 
গিয়ে প্রাইজ নেওয়। প্র্যাকটিস করতাম--“নাম ডাকতেই এগিয়ে 
যাবে, দেরি করবে না । আবার বেশী তাড়াতাড়ি হুড়মুড়িয়েও যাবেনা, 
সামনে গিয়ে মাথা নীচু করে “বাও' (১০৬ ) করবে--হাত পেতে 
প্রাইজটা নিয়ে, আবার “বাও' করবে । খবরদার যেন মেম-সাহেবের 
দিকে পিছন ফিরে। না। তার দিকে মুখ করে, আন্তে আন্তে কয়েক 
পা পিছু হটে আসবে ।” একবার একটি ছোট্ট মেয়ে বেশ কায়দা- 
মাফিক গিয়ে “বাও' করে ঈ্াড়াল, কিন্তু যেই মেম-সাহেবের হাতে 
সুন্দর একট৷ পুতুল দেখল আর স্থির থাকতে পারল না । পুভুসটাকে 
মেম-সাহেবের হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরে 
এমনি উধ্ব শ্বাসে ছুটে পালাল যে, সভান্বদ্ধ লোক হেসে লুটোপুটি । 

সেইসব জমকালো! দিনের কথা মনে পড়ে-_স্কুলবাড়ি ফুল পাতা 
নিশান দিয়ে সাজান*হয়েছে, আমরাও সেজেগুজে সার দিয়ে দাড়িয়েছি 
গোলাপী সিক্ষের শাড়ি পরে, গোলাপী রিবন প্রজাপতির মত করে 
চুলে বেঁধে আমার নিজেকে বেশ বড় বড় মনে হচ্ছে (সেই আমার 
প্রথম শাড়ি পরা )। সামিয়ানার নীচে সারি সারি চেয়ারে সভার 
লোকেরা বসেছেন, বেদীর উপরে সিংহাসনের মত চেয়ারে লাটসাহেব 
ও তার মেম-সাহেব বসেছেন । মেম-সাহেবের হাতে প্রকাণ্ড ফুলের 
তোড়া । লাটসাহেবের পরনে সাধারণ স্থ্যুট কিস্তু তার পিছনে 
যে “এডিকং” দাড়িয়েছে তার সোনার ঝালর দেওয়া জমকালো 


১৮ 


পৌঁষাক*' কোমরে তলোয়ার ফোলানে! ৷ . ছোটদের মধ্যে অনেকে 
তাকেই লাটসাহেব মনে করেছে । গান, আবৃত্তি, অভিনয়, বতুতা 
ধেষে পুরস্কার বিতরণ । পুরস্কার হয়তে! তেমন কিছুই নয়। পুতুল, 
খেলনা, কিংবা একটা বই । কিন্তু তার যধ্যেই কত আনন্দ ! 
আরেকট! আনন্দের দিন ছিল, স্কুলের জন্মদিন । সেদিন আমাদের 
আলিপুর চিড়িয়াখানায়, শিবপুর বটানিক্যাল গার্ডেনসে কিংবা অন্য 
কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হ'ত। এতগুলি ছেলেমেয়ে মিলে 
কলরব করতে করতে রিজার্ভ ট্র্যান্নে কিংব৷ নৌকোয় যাওয়া, সারাদিন 
হৈ-চৈ, গান ও খেলা, গাছতলায় সারি সারি বষে খাওয়া, সন্ধ্যার সময় 


'“একটা 

বাদর হাত 
বাড়িয়ে একটি 
ছেলের 

হাত এমন 

শত করে ধরল:"" 





দল বেঁধে বাড়ি-ফেরা__ভারি আনন্দে কাটতো! দিনটা । মাঝে মাঝে 
একেকটা মজার কাণ্ডও ঘটত । একবার চিড়িয়াখানায় একটা বঝাদর 
একটি মেয়ের লাল শাড়ি দেখে এমনি পছন্দ করল যে, আচলটা টেনে 
ছিড়ে নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে বসল । আরেকবার একটা বাঁদর 
হাত বাড়িয়ে একটি' ছেলের হাত এমন শক্ত করে ধরল যে, ছাড়ানো 
মুশকিল ! সবাই তাকে ঠাট্টা করে বলতে লাগল-_-«এত লোক 
থাকতে তোকেই কেন পছন্দ করল বল্‌ তো? নিজের জাতের লোক 
বলে চিনতে পারল বুঝি ?” একবার একটি মেয়ে গঙ্গার ঘাটে ঝুপ. 


১৯ 


করে জলে পড়ে গেল। তখনই তাকে টেনে তোলা! হুল, কিস্ত তার 
জামাকাপড় জলে কাদায় একাকার । কিআর করা যায়? একটা 
ছেঁড়াকাপড় দিয়ে লুচির ঝোড়াটা বেঁধে আনা হয়েছিল, সেটাই 
জড়িয়ে তাকে বসে থাকতে হ'ল। 

গ্রীষ্ম আর পুজার ছুটির জন্য যেদিন স্কুল বন্ধ হ'ত, সেদিন আমরা 
াদা করে খাওয়াদাওয়া করতাম ৷ বড় মেয়েরা রাম করত, আমরা 
কাজে সাহায্য করতাম । শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীদের খাইয়ে, তারপর 
নিজেরা একসঙ্গে বসে খুব আনন্দ করে খেতাম ৷ 

সেই আমাদের স্কুল এখন কত বড় আর প্রসিদ্ধ হয়েছে । এখন 
তার সুন্দর বাগান আর খেলার মাঠের নধ্যে মস্ত বড় বাড়ি, অনেক 
ছাত্র-ছাত্রী । দেখে কত আনন্দ হয় আর ছেলেবেলার কত কথাই 
মনে জেগে ওঠে । 


ডেলেবেলার দিনগুলি 


শ1-৬১১১ ৯১৯০১২৬৬১২১ 
87টিটাটি॥, 


সস 
১৯৪১ দে 


সস রি 2 





চতুর্থ পবিচ্ছেদ 


আমাদের ছোটবেলার কলকাতায় বিজলী আলো ছিল না, ছিল 
গ্যাসের আলো, আর তেলের বাতি । বিজলী-পাখার বদলে হাত- 
পাখা আর টানা-পাখা । কাপড়ের কিম্বা মারের ঝালরওয়ালা লম্বা 
লম্বা কাঠের ডাণগ্ডা কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো থাকত, দড়ি দিয়ে 
টানতে হ'ত বলে তাকে বলতো “টানা-পাখা”। ঘরের মধ্যে লোকে 
আরামে কাজকর্ম করত, বিশ্রাম করত কিন্বা ঘুমোত, আর পাখা-কুলী 
বাইরে বসে দড়ি ধরে একবার টানত একবার টিল দিত। দড়ির 
টানে পাখা ছুলত, তাতেই বাতাস হ'ত। একরকম পাখাটানার কল 
দেখেছিলাম, তাতে একটা ডাগডার সঙ্গে পাখার দড়িটা আটকান 
থাকত। ডাগ্াটা খট খটু করে সামনে-পিছনে নড়ত, আর দড়ির 
টানে পাখাও ছুলত । আমাদের স্কুলে একজন পাখা-কুলী ছিল যেন 
জীবন্ত পাখা-কল । পায়ের সঙ্গে দড়িটা বেঁধে সে দিব্য আরামে ঘুম 
দিত, নাক ডাকার তালে তালে পা ছুলত, পাখাও চলত । এত ঘুমের 
মধ্যেও কি করে যে তার পা চলত বুঝতেই পারতাম না । 

তখনকার ট্রাম ছিল ঘোড়ায়-টানা। আবার খিদিরপুর ও 
আলিপুরের দিকে ট্রাম ছিল ইঞ্জিনে টানা । যতটা ধেশয়৷ ছাড়ত্ব আর 
শব্দ করত ততটা জোরে চলত না। তবু ঘোড়ার ট্রামের তুলনায় 
মনে হত কতই না তাড়াতাড়ি চলেছি । অমন প্রকাণ্ড ভারি গাড়ি 


২১ 


টানতে টানতে বড় বড় ঘোড়াগুলিও ক্লান্ত হয়ে পড়ত, তাই খানিক 
দুর অন্তর ঘোড়া বদল হ'ত: গরমের দিনে ঘোড়ার মাথায় টুপি 
দেওয়া হত্ত--অনেকটা সোলা-হাটের মত টুপি । কিস্তু ঘাড়ের দিকে 
অনেকখানি লম্বা । টুপির ছুই ধারে ছুই ফুটো-_-তার মধ্যে দিয়ে 
কান ছুটো বেরিয়ে থাকত । 

কত রকমের ঘোড়া-গাড়ি তখন ছিল, আজকাল মে সব বড় আর 
দেখা যায় না। কাজকর্ম করবার আর আপিসে যাবার জন্য অফিস- 
যান বা পাক্ষিগাড়ি, হাওয়া খাবার জগ্ঠ ল্যাণ্ডো, ব্যারূস ও ফিটন 
গাড়ি, ডাক্তারের রোগী দেখবার জন্য ক্রহাম গাড়ি । মোটর ত তখন 
ছিলই না, রাস্ত! দিয়ে সাইকূল গেলেও আমরা ছুটে গিয়ে দেখতাম । 

পাক্কির খুব চলন ছিল। মায়ের সঙ্গে এবাড়ি ও-বাড়ি বেড়াতে 
যেতে আমরা গাড়ির চেয়ে পাক্ষিই বেশী চড়তাম। একবার একটা 
গলির মধ্যে বেয়ারারা প1 পিছলিয়ে পাক্কিশুদ্ধ আমাদের নিয়ে পড়ে 
গিয়েছিল, সেই থেকে আমরা আর পাক্কি চড়তে চাইতাম না । দোলের 
সময় পান্কি-বেয়ারারা বকশিশ চাইতে আসত গায়ে-মাথায় আবির 
মেখে, একটা ছোট লাঠিকে বাঁশির মত করে ঠোঁটের কাছে ধরে তারা 
বাকা হয়ে নাচত, আর গান গাইত--“কেড়ি কনদ দ্ব মুড়ে এ-এ-এ” 
(কেলি কদদ্ব মূলে )। 

তখন সিনেম! ছিল না, কিস্তু ভাল ভাল সার্কাস ছিল । শীতকালে 
গড়ের মাঠে প্রকাণ্ড সব তাবু পড়ত। একবার আমাদের বাড়ির 
পাশে বড় মাঠটায় একটা সার্কাস এল । প্রথমে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গাড়ি 
করে মালপত্তর এল, দেখতে দেখতে মাঠটা ঘিরে টিনের দেওয়াল 
উঠল, বড় বড় প্ল্যাকার্ডে লেখা হল দি গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস” । প্রকাণ্ড 
তাবু উঠল, বাঁদর, কুকুর, ঘোড়া, খাঁচার মধ্যে বাঘ সবই এল। 
আমাদের কি মজা! ! সার্কাস তো খুবই দেখলাম, সার্কাসের লোকদের 


২$ 


জীবনধাত্রাও অনেকটা দেখতে পেলাদ। পিছন দিকে ছোট ছোট 
তাবু ও চালাঘরের মধ্যে তারা থাকত । তাদের ঘরকন্গা, খেলা 
প্র্যাকটিস করা, জন্তদের খাওয়ানো, পিছনের বারান্দায় দাড়িয়ে এসব 
দেখতে খুব ভাল লাগত। খেলা দেখবার সময় জরি ও সাটিনের 
ঝলমলে পৌশাক পরে, বুকে সারি সারি মেডল ঝুলিয়ে, তীবুর 
ভিতরের উজ্জল আলোতে তাদের চেহারা কী জমকালো দেখাত, 
আর বাইরে দিনের আলোয় সাধারণ পোশাকে তাদের যেন আর চেনাই 
যেত না। এই সার্কাসে প্রসিদ্ধ বাঙালী পালোয়ান শ্যামাকাস্তবাবু 
বাঘের সঙ্গে কুত্তি দেখাতেন, বুকের উপর প্রকাণ্ড পাথর রেখে 


যা 


| 






** এই সার্কাসে (৬: 
প্রসিদ্ধ বাঙালী পালোয়ান, ৪ | 
গ্রানাকান্তবাবু রা | 





বাখেব সঙ্গে || ১? 

কুত্তি [1৮ 887 ্ 
দেখাতেন... ৫ টা লু ছি | 
ভাঙতেন, আরো কত গায়ের জোরের খেলা দেখাতেন। মাসখানেক 
পরে সার্কাসওয়ালার৷ পাত তাড়ি গুটিয়ে আবার কোথায় চলে গেল। 

স্রন্দর ত্বন্দর পুতুলনাচ ছিল- রামায়ণ-মহাভারতের গল্প, যুদ্ধ, 
সং ইত্যাদি দেখাত। একটা বিলাতী কোম্পানীর পুতুল নাচ 
দেখেছিলাম, সেরকম স্বন্দর আর দেখিনি । বিশেষ করে সমুদ্রের 
তলার একটা দৃশ্য আজো মনে পড়ে । গভীর জলের মধ্যে প্রবাল, 


স্পঞ্ড ও শ্যাওলার জল, তার ভিতরে কত শামুক, ঝিনুক ও কীকড়া 
ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে কত নানা রঙের মাছ। একটা 





৩ 


রাক্ষুসে মাছ হাঁ করে তাদের গিলতে এল- ভয়ে তার! চারিদিকে 
ছিটকে পড়ল। জলে ডুবুরী নামল, হাজরের সঙ্গে, অক্টোপাসের 
সঙ্গে তার 'লড়াই হ'দ। অক্টোপাশ পা. দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরছে, 
কুড়ুল দিয়ে সে পা কেটে দিচ্ছে, গাই রঙে নীদ রখ লাগ হযে 
যাচ্ছে । আশ্চর্য সে দৃশ্য! 

প্রথম যে সিনেম! দেখেছিলাম তাতে গল্প কিছু ছিল না শুধু চলন্ত 
ছবি। সমুদ্রে ঢেউ উঠছে, জাহাজ ছুলতে ছুলতে চলেছে । হঠাৎ 
ঝড় উঠল, পাহাড়ের মত উ“চু হ'য়ে ঢেউ ফুলে উঠল,.জাহাজ বুঝি 
ডুবল। আবার আস্তে আস্তে সব শান্ত হয়ে গেল। কিংবা স্টেশনে 
ট্রেন এল, লোকের! ছুটোছুটি করে ' উঠল-নামল, কুলীর! মালপত্তর 
তুলল-নামাল, আবার ধোয়া ছেড়ে ট্রেন চলে গেল, প্ল্যাটফর্ম খালি । 
মজার ছবিও থাকত--একজন লোক বিজ্ঞাপন দেখে টাকের ওষুধ 
কিনে এনে নিজের টাকে লাগাল-_দেখতে দেখতে সুন্দর ঘন চুলে 
টাক ঢেকে গেল। লোকটি তো মহাখুশী। ওমা! খানিক পরে 
দেখে কি, হাতে মুখে কাপড়ে টেবিলে, যেখানেই একটু ওষুধ লেগেছে 
সেখানেই ভূস্ভুস্‌ করে চাপড়া চাপড়া ছল গজিয়ে উঠছে । আরেকজন 
লোক রাস্তায় যেতে যেতে স্টীম রোলার চাপা পড়ে একেবারে কাগজের 
মত পাতলা চ্যাপ্টা হয়ে গেল। খানিক পরে ছুটি লোক সাইকেলে 
চড়ে যেতে যেতে দেখল, রাস্তায় একটা কাগজের মত মানুষ পড়ে 
আছে। তারা সেটাকে তুলে নেড়েচেড়ে দেখল, ফিসৃফিস্‌ করে কি 
পরামর্শ করল, তারপর তার নাকেমুখে সাইকেলের পাম্প দিয়ে 
পাম্প করতে করতে বেলুনের মত করে ফুলিয়ে তাকে আবার দিব্য 
গোলগাল মানুষ বানিয়ে দিল। কয়েক বৎসর পরে, গড়ের মাঠে প্রকাণ্ড 
তাবুর মধ্যে এল্ফিন্ষ্টোন্‌ বায়োক্কেপ ( 81011086009 131050009 ) 
খুলল তারপর থেকে ক্রমে ভাল ভাল ছবি দেখতে পেলাম । 


৪ 


এরোপ্লেন তো তখন ছিল না বেলুনের কথাই শুনতাম । খুব 
ছোট্রটবেলায় কবে একবার গড়ের মাঠে বেলুন উড়েছিল সেটার 
কথা কিছু মনে. নেই কিন্তু তারপর অনেকদিন ধরে আমরা ছড়া! 
কাটতাম-_“উড়লো বেলুন গড়ের মাঠে, পড়লো বেলুন বসিরহাটে। 
তারপর একদিন ছুপুরবেলায় «বেলুন !” “বেলুন !” চিৎকার শুনে 
আমরা ছাতে গিয়ে দেখলাম একটা বেলুন উড়ে যাচ্ছে । বাবার 
দুরবীন দিয়ে দেখা গেল গোল বেলুনের নীচে বড় একটা বাস্কেটের 
মত জিনিস ঝোলানো, তার মধ্যে একজন সাহেব বসে গোছা গোছা 








(রি 
ঘট] 
রঃ বা 4 
দুপুর বেলায় টি ২ £ এ ২৪ 
“বেলুন 1” “বেলুন 1” ্ রে - 
চীৎকার... নও দী | 
একট! বেলুন উড়ে [100 ৰ 


কাগজের মত কি জিনিস ফেলছে । এসব কাগজে সাহেবের বেলুন 
উড়বার বিজ্ঞাপন ছিল । 

ছোটদের জন্য প্রথম বাংলা পত্রিকা ছিল “সখা ও সাথী”- প্রথমে 
দুটো আলাদা কাগজ ছিল, “সখা” আর “সাথী” নামে, অল্পদিন পরে 
দুটোকে এক করে হ'ল “সখা ও সাঘী” | “সখা ও সাথী” এলেহ দাদারা 
খুব আগ্রহ করে পড়ত, আমি তখনও পড়তে শিখিনি। ওরা পড়ত, 
আমি শুনতাম । তারপর এল “মুকুল” । ততদিনে আমিও পড়তে 
শিখেছি । তখন আমাদের দেশে ভাল ছাপা আর ছবি হ'ত না কিন্ত 
মুকুলের লেখা খুব সুন্দর ছিল_-কত ভাল ভাল গল্প ও কবিতা, সহজ 


২৫. 


বিজ্ঞানের কথা, ভ্রমণ কাহিনী, জীবন চরিত, ধাধা ইত্যাদি থাকত। 
ছোটদের উপযুক্ত ছবিওয়াল! বইও ক্রমে বেরল। ঠাকুরমাকে সুর 
করে রামায়ণ পড়তে শুনেছিলাম, বাবার কাছে রামায়ণ মহাভারতের 
কত গল্প শুনেছিলাম । এবার গল্পের মতই সহজ সুন্দর ভাষায় তার 
«ছেলেদের রামায়ণ”, “ছেলেদের মহাভারত” পেলাম আর পেলাম 
যোগীন্দ্র সরকারের নানা গল্প ও ছড়ার বই। এই সব হ'ল ছোটদের 
জন্য বাংলার প্রথম ভাল বই। ্‌ 

এখন সকলে কাচের নলের মধ্যে রাখা বীজ থেকে বসন্তের টিকা 
নেয়, আমরা ছোটবেলায় টিকা নিয়েছিলাম নির্ভেজাল “গো-বীজ” 
বসন্ত থেকে । রোগওয়াল৷ একট৷ বাছুরকে কোলে করে এনে তার 
গায়ের গুটি থেকে পৃ'জ নিয়ে টিক! দিয়ে দিত। 
আমাদের ছোটবেলায় কলকাতা শহরট। অনেক ছোট ছিল। এখন 
যেখানে চওড়া নতুন রাস্তার ছুধারে বড় বড় বাড়ি হয়েছে তার 
অনেকখানি ঝোপ জঙ্গল ডোবায় ভর! পাড়াগায়ের মত ছিল । কিন্তু 
সে কলকাতার মান ছিল কত ! সে ছিল তখন ভারতবর্ষের রাজধানী । 
“রাজভবন', এখন যেখানে বাংলার গভর্নর থাকেন, সেখানে 
থাকতেন ভারতের গভর্নর জেনারেল ( বড়লাট ), আর আলিপুরের 
“বেল্ভিডিয়ার”, এখন যেখানে “ন্যাশনাল লাইব্রেরী” আছে, সেখানে 
থাকতেন বাংলার গভর্নর-_-ছোটলাট। ভারত গভর্নমেণ্টের কেন্দ্র 
এখন দিল্লীতে, তখন ছিল কলকাতায়, স্থুতরাং তার জাকজমক আর 
গৌরব ছিল খুব । | 


২৬ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





পঞ্চম পরিচ্ছেদ . 


আমরা ছিলাম শহরবাসী । কলকাতায় জন্মঃ কলকাতাতেই বাস। 
প্রতি বৎসর ছুটির সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যেতাম পাহাড়ে, 
পশ্চিমে, কিম্বা আমাদের “দেশে | ট্রেনে, স্টিমারে, নৌকায়, 
অবশেষে হাতি এবং পান্কিতে চড়ে পূর্ব-বাংলায় আমাদের সেই গ্রামে 
যাওয়াটা আমাদের কাছে যেন মস্ত একটা এডভেঞ্চার ছিল। 

রাত্রে শিয়ালদহ স্টেশনে ট্রেনে চড়ে সকাল বেলায় গোয়ালন্দে 
স্টিমার ধরতাম। মস্ত মস্ত জাহাজ, তাদের নাম ছিল এলিগেটর, 
ক্রোকোডাইল, পরপয়জ; আবার একদল ছিল ঈগ্ল্‌্, কণুর, 
ভালচার। আমরা কেবিনের ভিতরে থাকতেই চাইতাম না, সারাদিন 
ডেকে দাড়িয়ে ছুধারের দৃশ্য দেখতাম । একেক জায়গায় নদী এত 
চওড়া যে, এপার থেকে ওপার ভাল করে দেখাই যায় না। বর্ষাকালে 
পল্মা নদীর শোতের এত জোর হয় যে, অনেক সময় ছুই তীর ভেঙে 
ভাসিয়ে নিয়ে যায় । কত ক্ষেত-গ্রাম ঘরবাড়ি, পুরনো দিনের কত 
কীতিচিহ্ন যে পদ্মা নাশ করেছে, তার ঠিক ঠিকানা নেই। সেজন্যে 
তার আরেকটা নাম “কীতিনাশা”। এক জায়গায় মা দেখাতেন 
এইখানে তার মামাবাড়ি ছিল-_পদ্মার ভাঙ্গনে গ্রামন্দ্ধ কোথায় তলিয়ে 
গিয়েছে । নদীর ধারে দাড়িয়ে আছে অনেক দিনের পুরনো মস্ত উচু 
“রাজবাড়ির মঠ,” বিক্রমপুরের জমিদার টাদরায় ও কেদাররায় তাদের 


২৭ 


মায়ের শ্ম্ীনের উপরে এই মঠ তুলেছিলেন । এই ছুই বীর ভায়ের নাম 
ংলার ইতিহাসে বিখ্যাত ৷ সম্রাট আকবরের সৈম্য যখন বাংলা দেশ 
জয় করতে এসেছিল, তখন বাংলার বারো জন প্রতাপশালী জমিদার 
(বারো ভুইয়া ) বাংলা দেশ রক্ষা করবার জন্যে সেই প্রবল মোগল 
সৈম্যের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাড়িয়েছিলেন। টাদরায় ও কেদার- 
রায় সেই বারো ভূ'ইয়ার মধ্যে ছজন। কয়েক বৎসর পর কাগজে 
পড়েছিলাম যে, সে অঞ্চলের প্রসিদ্ধ সেই মঠটাকেও পদ্মা গ্রাস 





“অন্ত মন্ত জাহাজ, তাদের নাম ছিল... 


বিকালের দিকে নারায়ণগঞ্জে পৌছে ট্রেনে উঠতাম। রাতছুপুরে 
কা৪রাইদ স্টেশনে 'নেমে নৌকায় চড়তে হত। কাছাকাছি গভীর 
জঙ্গল, স্টেশন থেকে নদীর ঘাট পর্যন্ত রাস্তায় শুনতাম নাকি ভয় 
আছে'। আলো নিয়েঃ লম্বা লম্বা লাঠি হাতেঃ অনেক লোকজন সঙ্গে 
থাকত-_ঘুমচোখে গিয়ে আবার নৌকোর মধ্যে পাতা বিছানায় শুয়ে 
পড়তাম । | 

সকালে উঠে দেখতাম এবার পদ্মা নয়, অনেক ছোট নদী দিয়ে 
চলেছি। বেল! হলে এক জায়গায় নৌকো বেঁধে সঙ্গের লোকজন 
রান্না করত, আমরা নৌকোর আড়ালে নদীতে নেমে স্বান করতাম । 


৮ 


নদীর ঢালু পাড়ে মাটির মধ্যে ছোট ছোট গোল গোল গর্ত, তার মুখের 
কাছে অনেক মাছের কাটা বসানো- শুনলাম ওগুলো! নাকি মাছরাঙা 
পাখির বাসা । ইঁছুর প্রভৃতি যাতে ঢুকতে না পারে, তাই মাছরাঙা 
পাখি মাছ খেয়ে তার কাটাগুলো৷ দিয়ে গর্ভের মুখে “কাটা তারের 
বেড়া' বানিয়ে দেয় । লম্বা ঠোটওয়ালা স্ৃন্দর নীল মাছরাউ! পাখিকেও 
দেখলাম, জলের ধারে গাছের ডালে চুপ করে বসে আছে-_মাছ 
দেখতে পেলেই তীরের মত ছে মারছে । 

স্নান করে, খেয়ে দেয়ে, আবার ছ্ধারের দৃশ্য দেখতে দেখতে 
যেতাম, সারাদিন খেলা, গল্প ইত্যাদি হত। একবার আমরা নৌকোর 
মধ্যে বসে গল্প করছি, স্থযম৷ দিদি জানালার উপরে চড়ে বসেছে। 
জানালাটা যে ভাল করে আটকানে৷ ছিল না তা সে দেখেনি; যতই 
সে জানালায় ঠেস্‌ দিচ্ছে, ততই জানালা ফাক হচ্ছে। হঠাৎ আমরা 
চেয়ে দেখি, স্বষমা৷ দিদির মাথা আর হাত-পা*ই শুধু ভিতরে রয়েছে, 
সমস্ত শরীরটা বাইরে ঝুলে পড়েছে। বড় বড় চোখ করে সে 
প্রাণপণে হাতে-পায়ে জানালা, আকড়ে রয়েছে, কিস্তু টু' শব্দটি 
করছে না । আমরা চেঁচামেচি করাতে বড়রা কে যেন ছুটে এসে 
তাকে টেনে তুললেন, আরেকটু দেরি হলেই একেবারে ঝ-পা-ৎ ! 

নৌকো যখন গিয়ে ঘাটে লাগত, তখনও বাড়ি অনেক দূর। 
ঘাটে হাতি, পাক্কি-ডুলী অপেক্ষা করত। একটা বড় হাতি ছিল, সে 
“পাগলা” বলে তার পিঠে কেউ চড়ত না, মালপত্র সব তার পিঠে 
চাপানো হত। ছোট হাতীটা খুব শান্ত, বাবা-কাকারা তার পিঠে 
চড়তেন, আমরা ডুলী-পাক্িতে ভাগাভাগি করে চড়তাম। মনে পড়ে, 
একবার মা টুনী মণিকে নিয়ে পাক্ধিতে চড়লেন, সুরম! মাসী আর দিদি 
উঠল একটা সুন্দর চূড়োওয়াল! “মহাপায়াপতে (চতুর্দোলার মত ), 
দাদার আর. আমার.ভাগ্যে জুটল একটা বাঁশের ডুলী। আমি কেঁদে- 


২৯ 


কেটে জোর করে দিদি আর স্থুরম! মাসীর মাঝখানে ঠেসে দোলায় 
চেপে বসলাম, দাদা লক্ষ্মী ছেলের মত একাই ডুলীতে গেল । বাড়ি 
পৌছতে পৌছতে প্রায় সন্ধ্যা হত, কারা যেন শখ বাজাত, ঠাকুরমা, 
পিসীমারা এগিয়ে এসে আমাদের আদর করে ঘ্বরে নিয়ে ষেতেন। 
দেশের ঘরবাড়ি, বাগান, পুকুর, আমাদের কাছে সে এক নতুন 
রাজ্য । বাগানে অজত্র ফুল, কৌচড় ভরে তুলে আনতে কত আনন্দ । 
গাছের পাকা ফল নিজের হাতে পেড়ে নিতে কী মজা ।. শ্বেতপাথরের 
খেলনার মত সুন্দর চিনির তৈরী হাতি-ঘোড়া, রথ, গ্রামের কুমোরের 
হাতে-গড়া লাল পোড়ামাটির খেলনা ; টানা টানা চোখ আর টিকলে। 
নাকওয়ালা, নাকে কানে গয়না পরবার ফুটোওয়াল!, মাটির নানারকম 
পুতুল ; কী চমতকারই লাগত ! সবচেয়ে চমৎকার লাগত ঠাকুরমা- 
পিসীমাদের হাতের তৈরী. নানারকম ক্ষীরনারকেলের মিষ্টি । সেইসব 
ক্ষীরের লাড়$ তিলের লাড়ু$ তক্তি, ক্ষীরের ছাচ, পাটিসাপটটা, গোকুল 
পিঠে, মুগপুলি, চন্দ্রপুলি, গঙ্জাজলির কথা কোনদিন ভুলিনি । ঠাকুরমা 
পিসীমা খন কলকাতায় আসতেন,. তখনও আমাদের চোখ থাকত 
তাদের সঙ্গের বড় বড় হাড়িগুলোর উপরে । মুখে সরা-চাপা, ময়দা 
দিয়ে জাটা সেই সব মাটির হাড়িতে নানারকম মিষ্টি ভরা থাকত । 

. বাড়ির গরুর ত্ধ-সর, পুকুরের মাছ, গাছের আম-কাঠাল, বাগানের 
ফল-তরকারি, ঘরে তৈরী পিঠে-পুলি, পাড়ার্গায়ের এইসব মুখাছ্ের 
চেয়ে টুকিটাকির উপরেও আমাদের লোভ কিছু কম ছিল না। সেসব 
রানাতেও আমাদের পাড়ার্গায়ের পিসী-দিদিরা বেশ ওস্তাদ ছিল। 
গাছ থেকে কাচা আম ক্রিংবা বরই ( কুল ) পেড়ে তেল-ন্থন-লঙ্কা দিয়ে 
এমন চাট্টনী বানাত যে ঝালের চোটে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেলেও 
হুস্হাস্‌ করে খেয়ে নিতাম । বেতগোট। ( বেত গাছের ফল ) পেড়ে, 
তেল-হুন মেখে, প1থরবাটিতে করে ঝাঁকাতে বীকাতে বলত, “আম 


$ 


পাকে, জাম পাকে, যামা-বাড়ির বেখুন পাকে ।” নাড়তে নাড়তে 
সেগুলো নরম হয়ে যেত, তখন খেতে হ্বন্দর সৃস্বাহ্ লাগত । 
আমাদের চোখে গ্রামের এসব যেমন নতুন, গ্রামের লোকদের 
চোখে আমরাও তেমনি নতুন। আমাদের সাজ-পোশাক, চাল-চলন, 
“কল্কাত্তিয়া” কথাবার্তা সবই তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করত। 
কলকাতা! শহরের গল্প শুনবার জগ্তা, শহর থেকে আনা কতররুম নতুন 
জিনিস দেখবার জন্য পাড়াপড়শির! ভিড় করে আসত । আমর! যখন 
তালে তালে নেচে নেচে কলকাতার স্কুলে শেখা খেলার গান গাইতাম, 
পাড়ার মেয়ের! উচ্ছৃসিত হয়ে বলত «আহা! ! ঠিক যেন ইন্দ্রপুরী !” 

দেশের ঘরবাড়ি ছিল অন্য রকমের । মাঝখানে শুধু একটা 
দোতাল! পাকাবাড়ি ও পুজার দালান, আর সব বড় বড় উচু উচু 
টিনের কিংবা “ছনের” ছাওয়া ঘর । কলকাতার মত ধেঁষাধেষি নয়, 
অনেকখানি জায়গা জুড়ে কতগুলি আঙ্গিন৷ ঘিরে ফাকা ফাকা আলাদা 
আলাদা ঘর । এঘর থেকে ওঘর যেতে আমাদের মনে হ'ত যেন 
এবাড়ি থেকে ওবাড়ি যাচ্ছি। 

একদিন একটা ঘরের পিছন দিয়ে যাচ্ছি হঠাৎ একটা ঝোপের 
মধ্যে থেকে তিনচার হাত লম্বা একটা কুমীর বেরিয়ে এল। আমরা 
তো “কুমীর” “কুমীর” চিৎকার করে পড়ি কি মরি হয়ে ছুটলাম। 
স্বন্দরকাকা বেরিয়ে এসে “আরে, ওটা কুমীর নয়__গোসাপ” বলে 
একটা টিল ছুড়ে সেটাকে তাড়িয়ে দিলেন । 

আরেকদিন আমি পিসীমার সঙ্গে পাড়া-বেড়িয়ে ফিরছি, আমাকে 
ঘাটের সি'ড়ির মাথায় দাড় করিয়ে পিসীমা পুকুরে পা ধুতে নামলেন । 
সন্ধ্যা হয়ে আসছে, গাছপালার মধ্যে জমাট অন্ধকার । আমার কেমন 
গা ছম্ছমূ করছে। হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে কি একটা! নড়ে উঠল আর 
হেঁড়েগলায় বলল, “ভৃতুম ! ভূত--ভৃত- ভূতুম !” আমি তো 


১ 


চিছকার কুরে উঠলাম, “ও পিসীগা, শিগ্গীর এসো 1” পিসীম! দৌড়ে 
এসে কোঁঞে দিয়ে বললেন, প্দূর বোকা মেয়ে? ভুত নয় 
ওট] পারি। হুতোম পেঁচা জানিধ না?” 

আমরা সাতার জানতাম না তাই পুকুরে স্নান করতাম না। 
একদিন ছোটপিসী চুপি চুপি সুরমা-মাসীকে বলল, “পুকুরে মান 
করতে যাবি 1 

সুবরমা-মাসী ভয়ে ভয়ে বলল, “যদি ডুবে যাই 1” 

“ভয় কি? আমি তে! রয়েছি !” 

“দিদি যে মানা করেছেন ?” 

«দিদি টের পেলে তো? এখন কেউ নেই ওদিকে 1” 

এমনি করে মাসীরই সমবয়সী পিসী ওকে ভুলিয়ে নিয়ে গেল। 
চারদিক ঘেরা একেবারে নির্জন খিড়্‌কিপুকুর, ওর! চুপি-চুপি স্নান 
করতে নামল, কেউ টের পেল না । আমাদের একজন দাদী ছিলেন, 
তার পরীক্ষা সামনে । নিরিবিলি বসে পড়বার জন্য তিনি উপরে 
গেলেন ; দোতলায় ছুপুরবেলায় কেউ থাকত না। পিছন দিকের 
জানালা খুলতেই তিনি দেখতে পেলেন পুকুরে জলের মধ্যে কি যেন 
একটা ঢেউ কেটে লাফিয়ে উঠল ! মাছ মনে করে তিনি সেই দিকে 
আঁকিয়ে আছেন, খানিক পরেই আবার সেই জিনিসটা! উঠেই ডুবে 
গেল। তখন দেখতে পেলেন মাছ নয়-_-ছোট একখানি হাত। তখনি 
ছুটে গিয়ে তিনি জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, সাতার কেটে সেই জায়গাটায় 
গিয়ে জলের নীচে হাতড়িয়ে ওদের তুললেন । ছৃজনে জড়াজড়ি করে 
জলের নীচে তলিয়ে গিয়েছিল, আরেকটু দেরী হলেই আর রক্ষা 
ছিল না। 

আরেকদিন হুপুরবেলায় দিদি দাদা আর আমি বাইরের পুকুরের 
নির্জন বাঁধা-ঘাটে বসে আছি, হঠাৎ কোথা! থেকে প্রকাণ্ড লম্বা একটা 


৩২. 


লোক এসে'হাজির । তার ছুই হাত রক্তমাখা, হাতের লম্বা ছুরিটা 
থেকে টপ-টপ, করে রুক্ত ঝরছে। দিদি আর আমি তো ভয়েই 
অস্থির, দাদা কিস্ত আমাদের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে 
লোকটার পথ আগলে '্রাড়াল। পরে অবশ্য জেনেছিলাম যে, 
লোকটা আমাদেরই বাড়িতে পাঁঠা কেটে পুকুরে হাত ধুতে এসেছিল, 
কিন্ত তখন তো আমরা তাকে ভীষণ দন্ত্ু-ডাকাত ছাড়া আর কিছুই 
ভাবতে পারিনি । দাদার বয়স তখন ছয় বৎসরের বেশী হবে না, 
ছোট্ট দাদার সাহস দেখে আমর! অবাক হয়ে গেলাম । 

একদিন রাত্রে একটা বিকট গর্জন শুনে আমর! ভয় পেয়ে গেলাম। 
মা বললেন, ওটা হাতির ডাক। অনেক দূরে, স্ু্সঙ্গের পাহাড়ের 
জঙ্গলে হাতি ধরে এখানে পবনখালির বাজারে বিক্রী করতে আনে, 
সেই হাতি ডাকছে । একদিন একট! ছানা-হাতিকে বিক্রী করবার 
আশায় আমাদের বাড়িতে নিয়ে এল । দিবা মোটাসোটা বাচ্চা, 
দেখলেই আদর করতে ইচ্ছ! হয়। কিন্তু তার গায়ে কি জোর! 
সঙ্গের লোকেরা কিছুতেই তাকে ভিতরে আনতে পারল না, শেষে 
ছুটো হাতি তাকে টেনে নিয়ে এল। এসেই সে রাগে ফৌস্ফোস্ 
করতে লাগল আর শু'ড়ে করে উঠোনের ধুলো৷ তুলে সকলের গায়ে 
ছিটিয়ে দিল। এটুঝু বাচ্চার রাগ দেখে সকলেই হাসতে লাগল । 

আমাদের যে ছুটে! হাতি ছিল তাদের নাম “যাত্রামঙ্গল” আর 
“কুম্বমকলি” । নাম শুনেই বোধ হয় বুঝতে পারছ যাত্রামঙ্গল ছেলে 
আর কুন্ুমকলি মেয়ে । কুন্ুমকলি খুব শান্ত, মাহুত গুপীদাদা তাকে 
বাড়ির ভিতরের আঙ্গিনায় এনে বলত, “মা-ঠাকরুণদের প্রণাম কর্‌।৮ 
সে একে একে ঠাকুরমা, পিসীমা, জ্যেঠিমা, মা, খুঁড়িম। সবাইকে প্রণাম 
করত- আস্তে আস্তে শু'ড়টি বাড়িয়ে দিয়ে পায়ে বুলোত, তারপর 
শু'ড় গুটিয়ে নিয়ে নিজের কপালে ঠেকাত। মাহুতের কথামত সে 


৩ 
৩% 


সুয়ে পড়ত, দাড়াত, ছই পা মুড়ে বসত, চার পা! মুড়ে বঘত, মাছতকে 
শু'ড়ে করে দোলাত, জড়িয়ে পিঠে তুলে নিত। 

যাত্রামজল খুব বড় আর সুন্দর, কিন্ত মে নাকি একবার পাঁগল 
হয়ে গিয়েছিল । এখনও মাঝে মাঝে তার মাথা গরম হয়। মাথা 
গরম হলে তার পিঠে কেউ চডত না । একদিন মাহুত যাত্রাকে নিয়ে 
বেড়াতে যাচ্ছে । সামনে একজন বুড়ি একটা পু'টলী মাথায় নিয়ে 
চলছিল, হাতি আড়চোখে পু'টলীটার দিকে তাকাচ্ছে দেখেই মাহুত 
বলল, “ও বুড়ি, পাল! 1৮ বুড়ো মানুষ, সেকি ছুটতে পারে ? যতই 





এ ॥ | ৬ ৯. ৈ মি 
রঃ ঙ রর 
শে ৮৫১ ্ঞ্ টি প্লে ৬ 
চে ৫০৫৭ পুতে শর 


“একজন বুড়ি গু টলী মাথায় নিয়ে চলছিল:.'মাহুত বলল, “ও বুড়ি, পাল! 1”... 

সে ছোটে হাতিও নত লম্বা লম্বা পা চালায় । ভাগ্যিস সামনে একটা 
খাল ছিল, তাতে ঝাপিয়ে পড়ে সে ডুবসসাভার কেটে পালিয়ে বাঁচল। 
পু'টলীটা ফেলেই পালিয়েছিল, হাতি এসে দাত দিয়ে সেটাকে কুটিকুটি 
করে ফেলল । এরপরে যাত্রার সেই লম্বা লম্বা ঈাত ছুটো৷ করাত দিয়ে 
কেটে ভোতা৷ করে দেওয়া হল। দাত কাটতে তো ব্যথা লাগে না, 
তবে সারা গ! নাকি শির্শির্' করে । যাত্রার নিশ্চয়ই খুব খারাপ 
লেগেছিল । এরপর থেকে যে লোকটি শাখের করাত দিয়ে তার দাত 
কেটেছিল দূর থেকে তাকে দেখলেই যাত্রা ভীষণ ক্ষেপে উঠত । 


৩৪ 






_- পাগলাহাতি বীধা রয়েছে, এক বুদ্ধি তার সামনে দিয়ে যাচ্ছে, 
মাহুত ডেকে বলল, “ও বুড়ি, ওদিকে যাঁস না, হাতি কিন্তু পাগলা 1” 
বুড়ি একগাল হেসে বলল, “না-গ্গো, যাত্রা আমারে কিন্তু কয় না ।” 
একটু বাহাছুরী দেখাবার জন্য একেবারে কাছে এগিয়ে সে হাতির 
শুঁড়ে হাত বুলোতে গেল। যেই :/ হাত তুলেছে অমনি যাত্রা তার 
এ ভৌতা দীত ছটো৷ বুড়ির ছুই বগলে দিয়ে মারল এক গু'তো। 
বুড়ি একেবারে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে সাত হাত দূরে ছিটকে পড়ল ! 
জল দিয়ে, বাতাস করে, সবাই তো বুড়িকে সুস্থ করে তুলল কিন্ত 
এরপর থেকে তাকে দেখলেই লোকে ক্ষেপাত-_“কি-গেগা, যাত্রা 
তোমারে কিন্ত্র কয় না !” 

যাত্রা মাঝে মাঝে শিকল ছি'ড়ে পালাত, তখন হুলুস্ুল পড়ে 
যেত। একদল লোক তাকে ধরতে ছুটত। লোকজন আসছে 
দেখলেই সে আড়ালে গিয়ে লুকাত কিস্তু ছেঁড়া শিকলের ঝন্ঝনানিতে 
লোকে বুঝে ফেলত সে কোন দিকে যাচ্ছে । একদিন সন্ধ্যাবেলায় 
কেউ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না, শিকলের শব্দও পাচ্ছে না। খুঁজতে 
খুঁজতে দেখে একট উ চু ঘরের পিছনে যাত্রা চুপ করে দাড়িয়ে আছে 
আর ছেঁড়। শিকলের ডগাটা সাবধানে শুড় দিয়ে তুলে ধরেছে যাতে 
শব্দ না হয়। সেও বেশ বুঝে নিয়েছে যে, এই শিকলটাই যত নষ্টের 
গোড়া । | 
মাথা ঠাণ্ডা রাখবার জন্য যাত্রাকে খুব দই খাওয়ান হত। এক 
গামলা দইচি'ড়ে সামনে ধরে দিলেই সে আর সব ভুলে একমনে সপাৎ 
সপাৎ করে খেত আর সেই ফাকে মাহুত যা করবার করে নিত । ছুটো৷ 
হাতিতে মিলে সারাদিন কত যে খেত, দেখে আমরা অবাক হয়ে 
যেতাম । কচি ডালপাতা, কলাগাছ, কাঠাল, কলা, বেল, দইচি'ড়ে, 
খাচ্ছে তো খাচ্ছেই । সেই জন্যই তো৷ কেউ যদি ভীষণ রকম খায়, তবে 


৩৫৪ 


লোকে বলে “বাব! ! যেন হাতির খোরাক !” তা" হাতি বেচারার 
দোষ কি? ওর অত বড় শরীরে অতখানি শক্তি রাখতে হবে তো? 
আবার একদিন হাতি-পাক্ষি চড়ে ঘাটে এসে নৌকায় চড়ে বসতাম 
বাড়ি ফিরবার জন্য । ফিরবার পথে গোয়ালন্দে বড় বড় তরমুজ 
কেনা হত। পদ্মার চরে চমতকার তরমুজ হয়। একবার একজন 
কুলীর মাথায় প্রকাণ্ড একটা তরমুক্ত দেখে আমরা বলে উঠলাম, 
“ঈীস! কত বড়!” সে হেসে বলল, “একঠো আউর ভি বড়া 
হায় ।” চেয়ে দেখলাম আরেকজন লোক একটা অতিকায় তরমুজ 
্ন্যাটফর্মে গড়িয়ে গড়িয়ে আনছে । এত বড় তরমুজ আর কখনও 


দেখিনি । 
বড় হয়ে আর দেশে যাইনি । পঞ্চাশ বছরে তার না জানি কত 


পরিবর্তন হয়েছে । সেই নদী-বিল-মাঠ, সবুজ ধানক্ষেত, পাটক্ষেত, 
ঘন আমকাঠালের বাগান, সে সব হয়তো তেমনই আছে, কিন্ত সে 
ঠাকুরমা-পিসীমা'রা তো আর নেই। সেই সব দাদা-দিদিরাও সব কে 
কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে, সেই সব ঘরবাড়ি এখনও আছে কিনা কে 
জানে! 


৩৬ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ | 

খুব ছোট্টবেলায়' কত জায়গায় যাওয়া হয়েছিল মনে নেই, তবে 
পচন্বার কথা কিছু কিছু মনে পড়ে । আমার বয়স তখন সাড়ে চার 
বৎসর । ফাঁকা মাঠের মধ্যে বাড়ি ছিল, রাত্রে চৌকিদার হাক দিয়ে 
যেতো, “বা-_বুঁ_জাগল্‌ হো'**?” একেকদিন রাত্রে খুব চেঁচামেচি 
শুনতাম, “ভালু!” “ভালু!” মহুয়া খেতে ভাল্ল,ক খুব ভালবাসে । 
সামনের মাঠের মধ্যে গাছে যখন মহুয়া পাকত, তখন তার লোভে 
ভালুক এসে জুটত । লোকেরা মশাল নিয়ে ছুটত আর বিকট হল্লা 
করে, টিন বাজিয়ে ভান্গুক তাড়াত। আমরা ভয়ে লেপের মধ্যে 
আরও ধেঁষার্ধেষি করে শুতাম। 

সকালে বেড়াতে গিয়ে কত সময়ে দেখতাম ছোট ছোট ঝোপগাছে 
কুল পেকে লাল হয়ে রয়েছে, তুলতে গেলেই সঙ্গের চাকর লছমন 
বলত, “দাড়িয়ে দাড়িয়ে তোল, খবরদার বসবে না-_তাহলেই: 
ভালুক আসবে ৷” আমর ভয়ে ভয়ে দাড়িয়ে কুল তুলতাম। তখন 
তো বুঝতাম না ওসব লছমনের চালাকি । বসলে পাছে ধুলোমাটি লেগে 
আমাদের জামা-কাপড় নোংর! হয়, তাই মিথ্যা ওরকম ভয় দেখাত । 

আমার একটা দোষ ছিল বাগানের গাছে ফুলের কুঁড়ি দেখলেই 
ছি'ড়ে নিতাম। একবার গাছে একটা লাউ হল। দাদ]-দিদিরা 
বারবার আমাকে শাসিয়ে দিল যেন ওটা না ছিড়ি। আমি ঘুরেফিরে 
বারবার এসে দেখছি কচি লাউটা৷ মাচায় ঝুলছে । তার গায়ে কেমন 


৩৭ 


পলকাটা নরম রোয়ায় তরা । যত দেখছি ততই লোভ হচ্ছে কিস্ত 
নিতেও সাহস হচ্ছে না। শেষে ছুপুরে যখন কেউ কোথাও নেই, 
তখন আর লোভ সামলাতে পারলাম না। প্‌ করে সেটাকে নিয়েই 
দে-ছুট। বিকালে খাবার সময়ে আমাকে কেউ খুঁজে পেল না, 
ডেকে ডেকে সাড়া পেল না, সকলে ব্যস্ত হয়ে উঠল । বেলা পড়ে 
এল, রোয়াকের উপর রোদে-দেওয়া বিছানাগুলো৷ ভুলতে গিয়ে ঝি 
দেখল কি, তার মধ্যে আমি ঘুমোচ্ছি! দোষ করে, ভয়ে লেপের 
মধ্যে লুকিয়েছিলাম, তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি । 

বাড়ির সামনের মাঠে সাওতাল নাচ দেখতাম । গলায় মালাপরা, 
ঝাঁকড়া চুলওয়ালা সীওতাল ছেলের! মাদল বাজাত আর খোঁপায় ফুল- 
গোঁজা গয়নাপর! সাওতাল মেয়ের হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে, 
কেমন সুন্দর নাচত। “বাশ-বাজি” দেখলাম একদিন । কতগুলি 
লোক লম্বা বাশ নিয়ে নানারকম ব্যালান্সের খেল! দেখাল । একজন 
লোক বাঁশট! হাতের তেলোর উপর খাড়া করে রাখল আর একজন 
ছোট্ট ছেলে তার ডগায় উঠে কতরকম ডিগ্বাজি খেল, চক্ষিবাজির 
মত ঘুরপাক খেল। সবশেষে ছুটো খুব উচু বাশ মাটিতে পু'তে, 
মাথায় একটা দড়ি টান করে বেঁধে দিল। ছোট্ট ছেলেটা সেই বাঁশ 
বেয়েউঠল। তার মাথায় একটা মস্ত হাড়ি উপুড় করে মুখটুখ সব 
ঢেকে দিয়েছে, সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না । নীচে বসে তার বাবা 
বাজনা বাজাল, তার ' মা গান গাইল, আর তারই তালে তালে পা 
ফেলে, ছেলেটা ধীরে ধীরে দড়ির উপর দিয়ে পার হয়ে গেল। 
আমাদের ভয় হচ্ছিল, এই বুঝি পড়ে যায়! কিন্তু চোখ ঢাকা 
অবস্থায়, শুধু একটা লাঠি হাতে নিয়ে ব্যালান্স করতে করতে কি 
সুন্দর চলে গেল। . 

খাকো-নদীতে, শ্লেট-নদীতে, তিলৌড়ি পাহাড়ে পিকনিক হত । 


্ঞট 


গোঁরুর গাড়িতে কিংবা মানুষ-টানা 'পুশ পুশ. গাড়িতে চড়ে যেতাম । 
খিচুড়ি রান্ন৷ হত, পায়েস হত, গাছতলায় বসে খেতাম। টুনী ছোট্ট 
ছয়-সাত মাসের ছিল, তাকে বেতের দোলা-বাস্কেটে করে নিয়ে গিয়ে 
গাছে দোলা টাঙিয়ে দেওয়া হত। কত লুন্দর সুন্দর নানারঙের 
হুড়িপাথর, শ্লেট-নদী থেকে শ্লেটপাথর, মিছরির টুকরোর মত ধবধবে 
সাদা ও স্বচ্ছ চকৃ্মকি পাথর কুড়িয়ে আনতাম। চকমকি পাথর 


**একজন লোক 
ৰাশটা 

হাতের তেলোর উপর 
খাড়া করে রাখল 
আর 

একজন ছোট্ট ছেলে 
তার ডগায় উঠে 
কত রকম 
ডিগবাজি খেল, 
চফিবাজির মত 
ঘুরপাক খেল:'*' 





ঘষলে আগুনের ফুল্কি বেরোয় । ৫ 
চওড়া বারান্দায় চকমকি পাথরের “রেষ্”* দিতাম । বারান্দার 
সিমেণ্টের উপর ঘষটে ছেড়ে দিলে ঝিকৃঝিক করে আগুন বার 
করতে করতে যেত, সন্ধ্যার অন্ধকারে ভারি সুন্দর দেখাত । আমরা 


সারি সারি বসে পাথর ছেড়ে দেখতাম, কার পাথর সবচেয়ে তাড়াতাড়ি 
যায়, আর সবচেয়ে বেশী আগুন বেরোয় । 


৩৯ 


ছেলেবেলার দিনগুল্গি 





র সপ্তম পরিচ্ছেদ 
চুণারের কথা খুব মনে পড়ে। একেবারে গঙ্গার উপরে শ্ুন্দর মস্ত 
বাড়ি, ফুলবাগান, ফলবাগান, নদীর ধারে বসবার জন্য গোল লাল 
পাথরের বেদী, সুন্দর বাঁধানে! ঘাট, কিস্ত আমাদের সবচেয়ে প্রিয় 
জায়গা ছিল বের্দার পিছনে মস্ত একটা বালির টিপি । সেখানে বালি 
খুড়ে ঘরবাড়ি পাহাড় বানাতাম, কত শামুক বিন্নুক বালির মধ্যে থেকে 
খুঁজে বার করতাম। 

রোজ গঙ্গায় মান করতাম । হয় কোলে চড়ে, নয়তো কারো হাত 
ধরে জলে নামতাম । স্ুরমা-মাসী একদিন জলে নেমে গামছাখানি 
নদীর জলের উপরেই রেখে দিল-_যেমন কলকাতায় চৌবাচ্চার পাড়ে 
গামছা রাখত-_খানিক পরে গামছা আর খুঁজে পায় না, ততক্ষণে 
ঢেউয়ে ঢেউয়ে কোথায় ভেসে গিয়েছে । 

আমাদের বুড়ো চাকর গোবর্ধন একদিন গঙ্গার ঘাটে বাসন মাজতে 
মাজতে দেখতে পেলো মস্ত বড় একটা মাছ একেবারে কিনারে এসে 
সক্ড়ি ভতগুলেো কপকপ. করে খাচ্ছে । জলের ভিতরে মাছ কেমন 
করে নিঃশ্বাস নেয় জানো ? তার মাথার ছুই পাশে যে ছুটো কান্কো 
আছে, সে ছুটো একেকবার ফাক হয় আর কান্কোর ভিতরে চিরুণীর 
মত এক সেট বিল্লী আছে তার ভিতর দিয়ে জলটা ্েঁকে শুধু 
বাতাসটা ঢোকে । জলের নীচে মাছটা নিঃশ্বাস নিচ্ছে, কান্‌কো৷ ছুটে। 
একবার খুলছে একবার বুঁজছে, গোবর্ধন চুপ করে বসে তাই দেখছে । 


৪১ 


হঠাৎ খপ. যে ছুই কানকোর মধ্যে ছুই হাত চুকিয়ে সে মাছটাকে 
ধরে ফেলল । মাছটা প্রাণপণে পালাতে চাচ্ছে, গোবর্ধনও ছাড়বে 
না। শেষে যখন তাকে কোমর-জলে টেনে নিয়ে গেল, তখন সে 
ভয়ে চীৎকার আরপ্ত করল । ঠাকুর-চাকর সব ছুটে গিয়ে মাছটাকে 
টেনে ডাঙ্গায় তুলল । প্রকাণ্ড বড় মাছ, খুব ভোজ হ'ল। সবচেয়ে 
বেশী করে এবং প্রাণ ভরে খেলো! গোবর্ধন । 

সুন্দর একটা হুরিণছানা পুষেছিলাম, তার বাদামী রঙ্গের গায়ে যেন 
চন্দনের ফোটা কাটা । এত ছোট ছিল যে, নিজে কিছুই খেতে 





»*মাছটা প্রাণপণে পালাতে চাচ্ছে, গ্রোবর্ধ নও ছাড়বে না... 


পারত না। খুড়িমার ছোট্ট খোকা মায়ের ছুধ খেত, হরিণছানাও 
সেই সঙ্গে খোকার মায়ের ছুধ খেত। একটু বড় হয়ে আমাদের 
হাত থেকে কচি ঘাসপাতা খেতে আরম্ভ করল। আমাদের পিছন 
পিছন ছুটে যেত, কোলে নিয়ে আদর করতাম । হঠাৎ একদিন 
সকালে দেখা গেল, সেটা মরে পড়ে আছে। বোধ হয় সাপে 
কামড়েছিল। 

তারপর একদিন বাবা একটা কুকুরছানা নিয়ে এলেন। ভারি 
সুন্দর বাঁকড়া লোমওয়ালা ছোট্ট বাচ্চা রাস্তার ছুই, ছেলেরা টিল 
মেরে তার পা খেঁড়া করে দিয়েছে । মা তাকে সাবান দিয়ে আন 


৪২. 





করিয়ে পায়ে পট্টি বেঁধে দিলেন, ছ্ধ খাইয়ে এ কটা ক ঠের বাক্সে খড় 
দিয়ে বিছা করে দিলেন, যতদিনে তার পা সারল ততদিনে আমাদে 

সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল । তার নাম রাখলাম “ববী”। বাড়িওয়ালাদের 
ছুটে বড় বড় কুকুর ছিল, তাদের নাম টবী আর বুলী; তারা যেমন 
বাড়ি পাহারা দিত তেমনি ববীকেও পাহারা দিত। অন্য কোনো 
কুকুর ববীর কাছে ধেঁষতে পারত না । আমরা যেখানে যেতাম ববীও 
সঙ্গে যেত। যখন বালিতে খেলা করতাম, ববী পা দিয়ে বালি খুঁড়ে 


গতকরে একেবারে তার ভিতরে ঢুকে যেত, শুধু তার নাকটি আর 











ববী প! দিয়ে বালি খু'ড়ছে 


চোখ ছুটি বেরিয়ে থাকত । টারিনারাট রাবার রদ না যেত, 
দেখাই যেত না । যেই “ব-বী-_” বলে ডাক দিতাম, অমনি “ভৌঃ” 
বলে বেরিয়ে আসত । 

বাগানের পাঁচিল ধেঁষে কোন এক মুসলমান পীরের কবর ছিল, 
সূর্যাস্তের সময় দলে দলে লোক সেখানে নমাজ পড়তে আসত । 
সন্ধ্যার সময়, বাগানের আর এক কোনায় গ্রামের মেয়েরা অশ্বখতুলায় 
বাস্তণাপের পুজো! দিতে আসত । বিরাট অশ্বথগাছটার কোটরে 
প্রকাণ্ড এক জোড়! কেউটে সাপ থাকত, মেয়ের গাছতলায় প্রদীপ 


৪৩ 


দিয়ে ষেই বাস্তসাপের জন্য হুধকলা রেখে যেত। ভয়ানক পাপ আর 
কাকৃড়া বিছে ছিল সে-দেশে। আমাদের বাড়িভে একটা চমৎকার 
তুঁতগান্থ ছিল, খুব বড় বড় আর ভারি মিষ্টি ফল হ'ত তাতে। 
আমরা রোজ তার তলায় যেতাম- কেউ গাছে চড়ে থোপা থোপা ফল 
পেড়ে দিত, আঁচল ভরে নিয়ে আসতাম । একদিন দেখা! গেল, সেই 
গাছে পাঁচ-সাতটা বড় বড় সাপ কিল্বিল্‌ করছে। সেই থেকে আমরা 
আর সে গাছতলায় যেতাম না । 

হুমায়ুন আর শের-সাহের গল্প তোমরা শুনেছ__শেরসাহ যখন হঠাৎ 
চুণার ছুর্গ আক্রমণ করলেন, তখন হুমায়ুন ছুর্গের মধ্যে গোপন সুড়ঙ্গ 
দিয়ে পালিয়ে গেলেন। তিনি সাঁতার জানতেন না। গল্প আছে, 
একজন ভিত্তি নাকি তার মশকের ( জল নেবার চামড়ার থলি ) উপর 
বসিয়ে তাঁকে গঙ্গা পার করে দেয় । পাহাড়ের উপর সেই ছুর্গ, আর 
গঙ্গার ধারে যেখানে সেই সুডঙ্গের মুখ ছিল, দেখলাম । তখন কিন্ত 
সে ব্ৃড়ঙ্গ বুজে গিয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে আর যাওয়া যায় না। 

ছুর্গাকুণ্ড বলে একটা গরম জলের ঝরন! ছিল, তার ধারে একটা 
মন্দির, ভারি সুন্দর সে জায়গাটা । আমরা এ পাথর থেকে ও পাথরে 
লাফিয়ে ঝরনা! পার হতাম, ঝুঁচ গাছ থেকে লাল-কালে৷ কুঁচফল 
পাড়তাম, বন-করমচার গাছ থেকে বেগুনী রঙের ছোট ছোট পাকা 
করমচা তুলে খেতাম । 

চুণারে নানারকম পাথরের জিনিস, মাটির পুতুল আর গালার চুড়ি 
ও খেলনা খুব সুন্দর পাওয়া যেত। ওখানকার পাহাড় কেটে বড় বড় 
পাথরের চাকৃতি চালান যেত ঘরবাড়ি ব্রীজ ইত্যাদি তৈরী করার জন্য | 
একেকটা বড় পাথরে দেখতাম সুন্দর ঢেউকাটা দাগ-_ঠিক যেন কেউ 
খোদাই করে রেখেছে । পাহাড়ের উপরে পাথরের গায়ে ঢেউয়ের দাগ 
কোথ! থেকে এল ? বাবা বললেন, লক্ষ লক্ষ বছর আগে এই সব 


৪58 


জায়গা জলের নিচে ছিল, তখন জলের নিচের বালিতে ঢেউয়ের দাগ 
পড়ত। কতকাল পরে সেই সব জমি ক্রমে আন্তে আস্তে উ'চু হয়ে 
উঠল, জল সরে গেল, বালি জমে বেলে-পার্থর হয়ে গেল, কিন্তু পাথরের 
বুকে সেই ঢেউয়ের দাগ চিরদিনের মত অক্ষয় হয়ে রইল । 


৪৫ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 












টিটি] 111) 
ভিন ||... | 





ন্‌ 15 রা | 
1 ৬২০ আর কস 6 ০০ টির 





5." হারার 





অষ্টম পরিচ্ছেদ 


চণারে যেমন গঙ্গার উপরে ছিলাম, মধুপুরে তেমনি ছিলাম রেল- 
লাইনের উপরে । একেবারে বাড়ির পিছনের পাঁচিল ধেঁষে ই. আই. 
আর. লাইন ছিল, যতক্ষণ বাড়িতে থাকতাম এ দিকেই মন পড়ে থাকত । 
ভিতরের চওড়া বারান্দায় সকালে যখন চা খাওয়া হ'ত, ঠিক সেই 
সময়ে পাশ দিয়ে হুস্‌ হুস্‌ করে মেইল ট্রেন চলে যেত। রোজ রোজ 
দেখে চেনা হয়ে গেলে গার্ডরা আগে থাকতেই হাসি-মুখ বাড়িয়ে 
থাকত, আমাদের দেখেই «গুড. মনিং” বলত । আমরাও «গুড, মনিং” 
বলে তাদের ইশারায় চায়ের টেবিলে খেতে ডাকতাম, তারাও ইশারায় 
বলত, “আসছি ।৮ প্রতিদিন এটা একটা নিয়মিত খেলা ছিল । 

একবার বাবা কি যেন কাজে কলকাতায় গেলেন, বাড়ির সামনে 
দিয়ে ট্রেন যাবার সময় বাবাকে দেখবার জন্য আমরা বারান্দায় দাড়িয়ে 
রইলাম । ট্রেন যখন এল, দাদারা “এ বাবা 1» “এ যে বাব! !” বলে 
চেঁচিয়ে উঠল, কিন্তু আমি দেখতে পেলাম না-_তাই কেঁদে ফেললাম । 
আসবার সময়ে আমাদের গাড়িটা সবুজ রঙের ছিল, তাই আমি হা করে 
সবুজ গাড়িই খু'ঁজছিলাম, কিন্তু এবারে বাবার গাড়িটা ছিল সাদা । 
এই কথা শুনে বাবা আমাকে চিঠিতে লিখলেন-_ 


রেলের যে সবুজ গাড়ি, 
তাতে ছিল একটি বুড়ি-_ 


৪৭ 


জালার মত মোটা আর করলার মত কালো, 
বসে ছিল সব ঢেকে, তাই তার ভিতর থেকে 
বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না ভালে! । 
নেমে এলাম তাড়াতাড়ি 
চড়লাম গিয়ে সাদা গাড়ি 
তাবপরে জানল! দিযে বাড়িয়ে দিলাম গলা-- 
যেই ঝাড়ির সামনে এলাম 
তোমাদের দেখতে পেলাম, 
কিন্ত আমি ভুলে গেলাম 'গুডমনিং' বলা! ! 


আমর! প্রায়ই স্টেশনে বেড়াতে যেতাম। প্ল্যাটফর্মে বসে ট্রেন 
আসা-যাওয়া, লোকজনের ওঠা-নামা, দেখতে খুব ভাল লাগত । 
স্টেশনের কাছেই একটা বড় বাঁধ ছিল আমাদের বেড়াবার খুব প্রিয় 
জায়গা । তার তিন দিক ঘিরে উঁচু পাড়ের উপর দিয়ে লাল রাস্ত! 
ছিল, রাস্তার ছুধারে লম্বা লম্বা “সীতাহার' গাছের সারি । মিষ্টি গঙ্ধ- 
ওয়াল! সুন্দর সাদা সীতাহার ফুল ঘাসের উপর পড়ে থাকত, আমরা 
কুড়িয়ে এনে মাল! গাঁথতাম। ছুই দিকের ছুই সিঁড়ি দিয়ে আমরা 
পাড়ের উপর ওঠা-নামা করতাম, বড়রা অনেক সময় ঢালু পাড় দিয়েই 
নামতেন। একদিন মনি বড়দের সঙ্গে নামবার জন্য আব্দার ধরল, 
সবাই বললেন, “তুমি ছেলেমামুষ, পারবে নাঃ পড়ে যাবে ।” তবু সে 
জোর করে ওদের সঙ্গে চলল। একটু গিয়েই আর সামলাতে পারল 
না, গড়গড় করে গড়িয়ে পড়ল । আমরা তো সিঁড়িতে দাড়িয়ে ভয়ে 
কাঠ হয়ে চেয়ে আছি, সে কিস্তু দমবার পাত্র নয়- গড়াতে 
গড়াতেই বলছে, “দেখছো! ! কেমন কায়দা করে নামছি !” যা হোক, 
অতটা গড়িয়ে পড়েও ছুয়েকটা আচড় ছাড়া আর কিছুই হয়নি-_খুব 
ঘাস ছিল কিনা । 

এ ছাড়া, মাঠে-ঘাটে, পাহাড়ে, শালবনে, ঝরনার ধারে বেড়ানো 


৪৮ 


তো ছিলই একদিস মাঠের মাঝখানে ছোট্ট একটা ডোবা শুকিয়ে 
পাতলা কাদ! হয়ে রয়েছে, তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে ছোটকাকা হঠাৎ 
বসে পড়ে খুব মন দিয়ে কি দেখতে লাগলেন । আমরা কাছে যেতেই 
আমাদেরও ইশারা করে বসে পড়তে আর চুপ করে থাকতে বললেন, 
তারপর আন্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন- কাদার মধ্যে কালে৷ কালো 
কয়েক জোড়৷ বিন্দু খুব আস্তে আত্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাকা খুব 
সাবধানে একট! তুললেন, তখন দেখলাম একটা মাছ । কাদার মধ্যে তার 
কিছুই দেখ যাচ্ছিল না, শুধু চোখ ছুটো এক জোড়া কালো! বিন্দুর মত 
বোঝা যাচ্ছিল। একে একে যতগুলি দেখতে পেলেন সব তুলে 
কাছের একটা নালাতে কাক ছেড়ে দিলেন । কাদার মধ্যে মাছগুলো 
বোধ হয় ভাল করে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না, কেমন নিজীব ভাবে 
অতি আস্তে আন্তে চলছিল । জলের মধ্যে পড়ে কি আনন্দে যে তারা 
সাতার কেটে বেড়াতে লাগল ! 

একদিন ছোটকাকার সঙ্গে বেড়াতে বেড়াতে শালবনের মধ্যে 
একট। ফাঁকা জায়গায় এলাম, তার চারদিকে বড় বড় পাথর ছড়ানে। 
আর ঝোপবঝাপ গাছ। লুকোচুরি খেলবার চমৎকার জায়গা! । আমরা 
এমনি খেলায় মত্ত হয়ে গেলাম যে, কাকা বারবার ডাকছেন, *যেলা 
হ'ল, এবার বাড়ি চল,” আমরা কিছুতেই শুনছি না, খালি বলছি, 
“না, না, আরেকটু পরে ।” অনেকক্ষণ খেলে ক্লান্ত হয়ে যখন বাড়ি 
যাবার মন হ'ল, তখন চারদিকে চেয়ে দেখি কাকা নেই। চিৎকার 
করে ডাকলাম, কোন সাড়া নেই। কী সর্বনাশ! কাক! রাগ 
করে আমাদের জঙ্গলে ফেলে চলে গেলেন নাকি? আমি 
আর টুনী-মনি তে৷ কাদতে আরম্ভ করলাম । দাদা বলল, প্বাড়ি 
চলো, আমি পথ চিনতে পারবো!” দিদি কিন্তু তাতে ভরসা পেল না । 
' অনেকক্ষণ পরে খানিক দূরে শোম! গেল-_*্টু-উ”-- আমর! ছুটে 
৪৪ 

৪1৫ 


সেই দিকে গেলাম, অমনি উপ্টোদিক থেকে আবার শোনা গেল, 
“টু-উ”। এই ভাবে বেশ খানিক নাকাল করে তবে কাকা ধরা 
দিলেন।' তারপর থেকে আর আমরা বেড়াতে গিয়ে ছু্মি 
করতাম না। 

আরেকজন হুষ্ট, মেয়ের গল্প বলি। মেয়েটি ছিল আমাদের চেয়ে 
কিছু বড়, আমাদের সামনের বাড়িতে তারা থাকত । বড্ড জেদী আর 
অবাধ্য ছিল সে, তার মা'র কথা মোটেই শুনত না। তার কাকা 
একদিন তাকে খুব বকলেন | বকুনি খেয়ে সে রেগে কেঁদে বাড়ি 
থেকে চলে গেল। তার মা ভাবলেন, সে বুঝি রাগ করে পাড়ার 
কারো বাড়িতে গিয়ে বসে আছে, কিন্ত সন্ধ্যা পর্যস্ত যখন সে বাড়ি 
ফিরল না তখন তিনি ব্যস্ত হয়ে খোজ করতে আরম্ভ করলেন! 
পাড়ার লোকে দল বেঁধে খুজতে বেরল, দলের সর্দার হলেন কুগ্তবাবু। 
বেজায় লম্বা বলে সবাই তাকে বলত--ঢ্যাক্সা-কুঞ্জ। একটা পড়ো- 
বাড়ির জানাল! বেয়ে উঠে ভিতরে উ'কি মেরেই বিকট চিৎকার দিয়ে 
হাত-পা ছেড়ে ঢ্যাঙ্গাবাবু সকলের ঘাড়ে পড়লেন আর বলতে 
লাগলেন_-“ভূত !” “ভূত 1” ভূতও ততক্ষণে খচ.মচিয়ে উঠে 
ঈাড়িষ্বেছে। সবাই দেখল, এক বেচার। সাদা গোর, সেও কম ভয় 
পায়নি! সারারাত খোজ করেও কেউ মেয়েকে পেল না, তাঁর মা' 
তো কেঁদে অস্থির । কলকাতায় তার বাবাকে টেলিগ্রাম করা হ'ল, 
পুলিসে খবর দেওয়া হ'ল, যত পুকুর, কুয়ে৷ সব খোঁজা হ'ল যদি 
অন্ধকারে পড়ে গিয়ে থাকে । পরদিন অনেক বেলায় ছুজন সাওতাল 
তাকে বাড়ি পৌছে দিল, বলল--তাকে ওরা কুড়িয়ে পেয়েছে? 
মেয়ের যা চেহারা হয়েছে--হাটতে পারছে না, কথা বলতে পারছে 
না। একটু সুস্থ হবার পরে সে বলল যে, রাগ করে কাদতে কাদতে 
সে যে ঝরনার ধার দিয়ে দিয়ে কতদুর চলে গিয়েছিল খেয়াল ছিল 


& ০ 


মা। হঠাৎ দেখল যে, সন্ধ্যা হয়েছে আর পথ হারিয়ে সে জঙ্গলে 
এসে পড়েছে। ঘুরে ঘুরে কোথাও পথ পেল না, তার উপরে 
বাঘের ডাক শুনে ভয়ে আধমরা হয়ে গেল। কোনোমতে একটা 
গাছে চড়ে সারারাত বসে কাটাল, ভোরবেলায় এ সাঁওতালরা 
কাঠ কাটতে জঙ্গলে এসে তাকে দেখতে পেয়ে বাড়ি পৌছে দিল! 
সে যে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে তাতেই বাড়ির লোকের! যেন 
বাঁচলেন। পাড়ার কেউ কেউ তাকে খুব বকুনি দেবার জন্য প্রস্তৃত 
হয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তার চেহারা দেখে আর কিছু বলতে মন সরলো৷ 





“হাত-পা ছেড়ে চ্যাঙ্গাবাবু সকলের ঘাড়ে পড়"্লন “ভূত 1 “ভূত [2 


না। ভাবলেন, “্যাক্‌, বেচারার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে ।” 

মধুপুরে আমাদের বাগানে চমৎকার গোলাপফুল হ'ত। এ 
অঞ্চলেই খুব ভাল ফুল হয়_-কলকাতার অনেক বড় বড় ফুলের 
দৌকানে এ অঞ্চলের ফুলবাগান থেকেই ফুল চালান আসে । আমরাও 
কলকাতায় ফিরবার সময় রাশি রাশি গোলাপফুল এনেছিলাম, 
আমাদের সঞ্চিত এক বোঝ৷ হুড়ি-পাথর ও চকৃমকি-পাথর এনেছিলাম, 
আর এনেছিলাম হড়ি-ভতি ক্ষীরের প্যাড়া ও ঝুড়ি-ভ্ি ডিম। 
সেখানে খুব বড় বড় টা্টক! ডিম খুব সম্তায় পাওয়া ষেত-_ গ্রামের 


১ 


মেয়েরা ফুড়ি' বোঝাই করে শিল্রণী করতে আমত । একথার ভার মধ্যে 
থেকে একটা অন্ভুত ডিম বেরল। মত্ত বড়, সরু লম্বা গড়ন, সেটা যে 
কিসের ডিম কেউ বলতে পারল না; কেউ ধলে রাজহ্বাসের ডিম, 
কেউ বলে কোনও জংলী পাখির ডিম, কেউ বলে কুমীরের ডিম । মা 
বললেন, “কিসেয় না কিসের ডিম তায় ঠিক নেই, ওটা খেয়ে দরকার 
নেই।” ধনকাকা কিস্ত সে কথা শুনলেন না। বেশ করে পেয়াজ 
লঙ্কা দিয়ে অমূলেট ভাজিয়ে খেয়ে ফেললেন আর বললেন, “্যারই ডিম 
হেকি না কেন, খেতে ভা-রি উপাদেয় 1” 


৬২ 


হেলেধেলার দিনত 





নবম পরিচ্ছেদ 

আমাদের ছেলেবেলায় বাংলা বইয়ে ভাল ছবি থাকত না, মে কথা 
আগেই বলেছি। যা কিছু সুন্দর ছবি আমরা বিলিতি বইয়েই 
দেখতে পেতাম । ভারতবর্ষে তখন ভাল ছবি তৈরী কিম্বা ছাপার 
কোনো উপায় ছিল না। বাবার প্রথম বই “ছেলেদের রামায়ণ” যখন 
প্রকাশিত হল, তার নিজের হাতে আকা স্ৃন্দর সুন্দর ছবিগুলি ছাপতে 
গিয়ে নষ্ট করে ফেলল । তখন থেকেই বাবা মনে মনে স্থির করলেন 
যে, আমাদের দেশে ভাল ছবি তৈরী ও ছাপার ব্যবস্থা করতে হবে। 
আজকাল ভাল ভাল বই ও পত্রিক! ইত্যাদিতে যে-সব স্বন্দর রঙ্গিন বা 
একরঙ্গ৷ ছবি দেখতে পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই হচ্ছে হাফ টোন 
ছবি। এই হাফটোন ছবিকি করে তৈরী করতে হয়, সে বিষয়ে 
অনেক বই আনিয়ে বাবা পড়লেন, তারপর হাফ টোন ছবি তৈরী 
করবার ক্যামেরা এবং অন্তান্য সরঞ্জাম আনবার জন্া বিলেতে অর্ডার 
দিলেন। এ-সবের জন্য তো অনেক জায়গা দরকার হবে, তাই 
আমাদের অন্য একটা বাড়িতে উঠে যাবার কথা হল। তারপর 
একদিন বিরাট বিরাট প্যাকিং বাক্স করে বিলিতি মালপত্র এসে হাজির 
হল। আমরা সারাটা সকাল বাইরের বারান্দায় দাড়িয়ে সেই সব মাল 
গোরুর গাড়ি থেকে নামানো আর ঘরে তোলানো দেখলাম । তার 
কিছু দিন পরেই আমরা নতুন বাড়িতে চলে এলাম । 

মাঝারি রকমের বাড়ি, তার মধ্যে একটা ঘরে বাবা স্টডিও তৈরী 


$৩ 


করলেন, আরেকটা ঘরে ছোট একটি ছাপার প্রেস বসল, অন্য একটা 
ঘরে ও বড় বারান্দায় নানারকম যন্ত্রপাতি রাখা হল। একটা স্নানের 
ঘরকে করা হল ডার্ক রম । তখন তে! এদেশে কেউ এসব জানে না, 
বাবা বই পড়ে পড়ে নিজের হাতে তা পরীক্ষা করে সব শিখতে 
লাগলেন । এমনি করে আমাদের দেশে হাফ্‌টোন ছবি তৈরীর 
স্ত্রপাত হল । 

নতুন বাড়িতে ছোট ভাইয়ের জন্ম হল। দাদা ও মনির নামের 
সঙ্গে মিল দিয়ে তার নাম হল স্ৃুবিমল, ডাক নাম নানকু. ( ছোট্র )। 
নানকু যখন মাত্র কয়েক দিনের, একদিন মা তাকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে 
আছেন। হঠাৎ চকাৎ চকাৎ শব্ধ শুনে চেয়ে দেখেন, পাঁচ বছরের 
টুনী পাস্তয়৷ খেতে খেতে ফোটা ফোটা রস টিপে টিপে ভাইয়ের মুখে 
দিচ্ছে আর ভাই দিব্যি চক্চক্‌ করে খাচ্ছে । মহা খুশী হয়ে টুনী মাকে 
তা দেখিয়ে বলল, “দেখ মা, কী সুন্দর করে খাচ্ছে!” মা তাকে 
বুঝিয়ে দিলেন যে এখন ওকে ওসব জিনিস দিতে নেই। তারপর 
নানকু যখন ছ' মাসের, একদিন রাত ছুপুরে জোর শব্দ শোনা গেল-_ 
“ওয়্যাও !” “ওয়্যাও !” শব্দ শুনে চমকে আমাদের ঘুম ভেলে 
গেল। দিদি ভয় পেয়ে ডাকল--“ও মা, কোথায় বেড়াল ঝগড়া 
করছে?” মা হেসে বললেন, “বেড়াল নয়, আরেকটি নতুন ভাই 
এসেছে, তোমার কাকীমার খোকা হয়েছে ।” খোকার হেঁড়ে 
গলা শুনে তো আমর! অবাক ! নানকুর সঙ্গে মিল দিয়ে তার নাম 
হল পানকু। 

নানকুর বাহন ছিল সখাওয়াৎ আলী। সাদা দাড়ি ও বাবরি 
চুল, সাদা পোশাক, মাথায় সাদা মসলিনের ফুলকাটা টুপী, সর্বদা 
হাসিমুখ, চমৎকার মানুষ । সে রোজ আমাদের বাড়িতে আসত, 
নানকৃকে ছুববেল! বেড়িয়ে না আনলে তার চলত না। নানকুও তার 


$৪ 


আসবার সময় হলেই “সখাই !” “সখাই !” বলে চঞ্চল হয়ে উঠত। 
তাই তাকে নানকুর বাহন বলা হ'ত। 

সখাওয়া আলী আমাদের খুব ভালবাসত, প্রায়ই নানারকম 
ফুল এনে দিত। একদিন সে একরাশ বেলফুল নিয়ে এল। শ্বেত 
পাথরের থালায় ধবধবে সাদা ফুল, স্বগন্ধে ঘর ভরে গেল । আমর! 
মহ! খুশী হয়ে বললাম, ঠাকুরমাঞ্জে পুজোর জন্য পাঠিয়ে দিলে হয় 
না? ও-ফুল ঠাকুরমার পুজোয় চলবে না৷ শুনে আমাদের ভারি ছুঃখ 
হল। এমন সুন্দর ফুল, সখাওয়াৎ আলী এত ভাল আর এমন 
পরিক্ষার, ওর ফুলে পুজো হবে না? কেন? 

নতুন বাড়িতে আমরা একটা আলাদা! পড়বার ঘর পেয়ে খুব খুশী 
হলাম। এতদিন স্কুলের টিচার কুমুদিনীমাপী আমাদের বাড়িতে 
পড়াতেন, এবার এলেন মাস্টারমশাই । বেঁটেখাটো ফস মানুষ, 
গম্ভীর লাল মুখ, দেখেই কেমন ভয় হল, মনে হল বুঝি খুব কড়া 
লোক। মনি তো প্রথমে কিছুতেই তার কাছে পড়বে না; হয় 
পালিয়ে যেত, নয় তো লুকিয়ে থাকত। অল্পদিনের মধ্যেই কিন্তু 
মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে আমাদের খুব ভাব হয়ে গেল। যেমন যত্ব 
করে পড়াতেন, তেমনি শক্ত হাতে পড়া আদায় করতেন। ছ্ষ্টমী 
করলে শাস্তি দিতেন, আবার পড়া ভাল করলে কত গল্প বলতেন, আর 
স্বন্বর হুৃন্দর ছবি এনে দিতেন। স্বরমামাপী আর দিদি কখনও 
হুষ্টমী করত না, টুনী ছোট বলে তার ছষ্টমী মাপ হয়ে যেত, শাস্তিটা 
জুটত দাদার, আমার, আর মনির ভাগ্যেই। শান্তিও ছিল অদ্ভুত 
রকমের-। কে কি খেতে ভালবাসে মাস্টারমশাইর সব খবর জানা 
ছিল ! ছৃষ্টমী করলে দাদার মাংস খাওয়া বন্ধ, মনির চা খাওয়া বন্ধ, 
আব আমার আম খাওয়া বন্ধ । 

মাস্টারমশাই কখনও কামাই নর্দান পড় 


৪৫৬ 


দিযে দিক্চো, এই ছিল ভারি ছংখ। এবয়ার ভিযি গরমের ছুটিতে 
ধাড়ি গেলেন, আমাদের অনেক পড়া দিয়ে গেলেন। আমরা সারা 
ছুঁটিটা খেলা করে কাটালাম, পড়াটা শেষ ক'দিনের জন্য ফেলে রাখা 
হ'ল। হূর্ভাগ্যের বিষয়, মাস্টারমশাই ক'দিন আগেই বাড়ি থেকে 
ফিরে এলেন । এসে দেখেন, আমরা কিছু পড়া করিনি । বারান্দায় 
ধসে বাব! ছবি জআকছেন, ঘরের মধ্যে মাস্টারমশাই আমাদের 
পড়াচ্ছেন আর ডেকে বলছেন-_“তাতা৷ রচনা লেখেনি”, “খুশী অস্ক 
রুরেনি” “মনি হাতের-লেখা লেখেনি” ইত্যাদি । ছবি আকতে 
জাকতেই বাবা বলছেন, “হু ।৮ পড়ানো শেষ করে মাস্টারমশাই তো৷ 
চলে গেলেন। এখন, আমরা কোন মুখে বাবার সামনে বেরোই ? 
মাস্টারমশাই সব বলে দিয়েছেন, তাই ভারি লঙ্জা করছে। অথচ 
এ বারান্দা দিয়েই বাড়ির ভিতর দিকে আসতে হয়। শেষকালে দাদ 
এক বুদ্ধি দিল। বাবা এক মনে আকছেন, টেবিলের উপর ছোট্ট 
ঈজেলে ছবিটা খাড়া করা আছে, তাতে তার মুখ ঢাকা পড়েছে । আমর! 
একে একে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে বারান্দাটা পার হয়েই দে-ছুটু। 

টুনী-মনির বইখাতা অনেক সময় মাটিতে ছড়ান থাকত বলে 
মাস্টারমশাই একদিন.দাদাকে বললেন, “ওদের জিনিসপত্র যা কিছু 
এদিক-ওদিক পড়ে থাকবে তুমি তা বাজেয়াপ্ত করে তোমার ডেস্কে 
রাখবে ।” দাদা আমাদের পেন্সিল ইত্যাদি যা কিছু কুড়িয়ে পেল সব 
ডেস্কে পুরল, তারপর টুনী মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে কি যেন করছিল, 
তাকেও চট করে তুলে নিয়ে ডেস্কবন্দী করল। অবিশ্যি নিঃশ্বাস 
নেবার জন্য ডালাটা একটু ফাক করে রেখেছিল। আমরা আপত্তি 
করাতে মুচকি হেসে বলল, “মাস্টারমশাইর অর্ডার-__যা কিছু মাটিতে 
পড়ে থাকবে তাই ডেক্ষে ভরতে হবে!” টুনীর চিৎকারে সুরমামাসী 
আর দিদি এসে তাকে উদ্ধার করল । 


€ত 





উড যেন ভেকে প্রহারয় 1” বলার সঙ্গে বউ 
এমনি «প্রহার” করেছে যে, তার হাতের কলমের নিব.টা মাস্টারমশাইর 
হাতে একেবারে বসে গিয়েছে । ঝর ঝর করে রক্ত পড়তে লাগল, 
মনিরও তেমনি ঝর ঝর করে কান্না! তারপর কতদিন পর্যস্ত আমরা 
ওকে “ভেকে প্রহারয়” বলে ক্ষেপাতাম । 

সেই ছোট্টবেলা থেকে এট্ট্াব্স পরীক্ষা পর্য্ত মাস্টারমশাইয়ের 
কাছে পড়েছি, কত আব্বার উৎপাত করেছি, ছুষ্টমী করে কত 
শাম্তিও পেয়েছি, কিন্ত সার ম্মেহ আর হয় পেয়েছি তার চেয়ে শতগুগে 
বেশি । 

স্কুলে লেখাপড়৷ করতাম, বাড়িতে মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়তাম, 
কিন্ত বাবার কাছে গল্পের মত করে মুখে মুখে কত কি শিখতাম, 
সেটাই সবচেয়ে ভাল লাগত । সহজ বিজ্ঞানের কথা, পৃথিবীর জন্ম- 
কথা, টাদ-নূর্য গ্রহ-নক্ষত্রের কথা ; এমনি কত কি। বাবার দূরবীণ 
দিয়ে টাদটাকে কি মুন্দর উজ্জল আর বড় দেখাত, টাদের পাহাড় 
আর গহ্বরগুলে! কেমন স্পষ্ট -দেখাত, শনিগ্রহের বলয়ও বেশ 
বোঝ! যেত । | 

এমন সহজ আর শ্ুন্দর করে বাবা বলতেন যে, কত সময়ে 
একজিবিশন কিংবা মেলায় গিয়ে দেখেছি, আমরা যেখানে যাচ্ছি, 
আমাদের ঘিরে একটা ছোটখাটো ভীড় জমা হয়ে যাচ্ছে। বাবা 
আমাদের সব বুঝিয়ে দিচ্ছেন, চারদিক থেকে লোকে ঝুঁকে পড়ে হা 
করে তাই শুনছে । 

একবার এই রকম একটা একজিবিশনে বাব! একটা কল দেখিয়ে 


গণ 


আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তাতে কি রকম করে কাজ হয়। অনেক 
লোক দাড়িয়ে শুনছে, একজন খুব মোটা ভদ্রলোক ঠেলেঠুলে সামনে 
এসে একেবারে আমাকে আড়াল করে গ্লাড়ালেন। আমি কিছুই 
দেখতে পাচ্ছি. না, কী করি? আন্তে আস্তে ভদ্রলোকের পিঠে 
সড়নুড়ি দিতে আরম্ভ করলাম । প্রথমে বোধ হয় পৌকামাকড় মনে 
করে তিনি ছুয়েকবার গা-ঝাড়৷ দিলেন, তারপর হঠাৎ চমকে ফিরেই 
একগাল হেসে বললেন, “ও বুড়ি, তুমি বুঝি দেখতে পাচ্ছো না ? এসো, 
এসো 1” এই বলে আমাকে সামনে টেনে নিলেন । আরেক দিনের 
কথা মনে পড়ছে । আমরা রেলগাড়িতে চড়ে কোথায় যেন বেড়াতে 
যাচ্ছি, আর ক্রমাগত বাবাকে প্রশ্ন করে চলেছি-_-«এটা কি?” *ওটা! 
কেন?” বাবা বুঝিয়ে দিচ্ছেন । খানিক পরে ওদিককার সীট, থেকে 
একজন তদ্রলোক উঠে এসে বললেন, “মাফ করবেন, আপনার সঙ্গে 
আলাপ না করে পারছি না। কী আশ্চর্য সুন্দর করে আপনি ছেলে- 
মেয়েদের শিক্ষা দেন! আমি এরকম আর দেখিনি।” আলাপ করে 
ছুজনেই খুব খুশী হলেন, কারণ নেই ভদ্রলোকও একজন নামকরা 
লেখক । পরস্পরের লেখার সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল, এতদিনে 
সাক্ষাৎ পরিচয় হ'ল।, 


&৮ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





দশম পরিচ্ছেদ 

নতুন বাড়িটা জ্যেঠামশাই ও পিসীমার বাড়ির কাছেই ছিল, সুতরাং 
খেলার সাথীর অভাব হ'ল না। জ্যেঠতু্ুতা, খুড়তুতো, পিসতুতো 
ভাইবোনদের দল জুটে গেল । | | 

ছাতের এক কোণে ঘোল! জলের ট্যাঙ্ক থেকে গঙ্গামাটি তুলে জমা 
করা ছিল, তাই দিয়ে গোলাগুলি বানিয়ে ভীষণ যুদ্ধ শুর হ'ল। সে 
যুদ্ধের নাম দেওয়া হয়েছিল পটগুল্টিশ, ওয়ার । নরম কাদার গুলিতে 
খেলা বেশ ভালই চলছিল । হঠাৎ কি কুবুদ্ধি হ'ল গুলিগুলোকে বেশ 
লাল করে পুড়িয়ে নিলাম । ছুপুরবেলায় যখন চাকরবাকরর৷ বিশ্রাম 
করতে যেত, তখন চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকে মরা উন্ুনের মধ্যে গুলি 
গুজে দিয়ে আসতাম, ওরা উন্নুন ঝাড়বার সময় সেগুলি বেছে ধুয়ে 
আমাদের দিয়ে দিত । কিস্তু তাতে দ্পক্ষই এমন ভাবে “আহত” হতে 
আরম্ভ করল যে, আমাদের রান্নাঘরে যাওয়াই বারণ হয়ে গেল। 

আরেকদিন জ্যেঠামশাইর বাড়িতে পটগুল্টিশ. খেলা হচ্ছে, 
হঠাৎ একজনের হাতের গোলাট। ছিটকে সি'ড়ির ছাতের তলার দিকে 
( সিলিংএ ) লেগে একেবারে ঘুঁটের মত চ্যাপ্টা হয়ে সেঁটে রইল । 
ভারি মজা, সবাই মিলে ঘু'টে দেওয়ার পাল্লা শুরু করলাম । দেখতে 
দেখতে ছাতটা কাদার ঘু'টেতে ভর্তি হয়ে গেল। এমন সময় জ্যেঠা- 
মশাইয়ের পায়ের শব্দ শুনে যে যেখানে পারল লুকিয়ে পড়ল । জ্যেঠা- 


৯ 


মশাইকে -ও বাড়ির ছেলেরা ভীষণ ভয় করত। তাঁর চেহারা আর 
গলার আওয়াজ ছিল গম্ভীর । শুনতাম তিনি মস্ত বড় খেলোয়াড়, 
গায়ে খুব জোর, আর রাগও খুব । আমরা কিন্তু কোনোদিন স্তর রাগ 
দেখিনি। যখনই ওবাড়ি যেতাম, দেখতাম তিনি একমনে লেখাপড়া 
করছেন। যদি কখনো আমাদের দিকে চোখ পড়ত, মুহ্ব হেসে 
ছয়েকটা কথা বলতেন। যা হোক, ওদের দেখার্দেখি। আমরাও 
লুকোলাম। ্‌ 

জ্যেঠামশাই আনমনে কি ভাবতে ভাবতে আস্তে আস্তে সিড়ি 
দিয়ে উঠছেন, হুঠাৎ থ্যাপ ঞ্করে কি. একটা তার পায়ের কাছে পড়ল । 





***ভীষণ যুদ্ধ শুরু হল। সে যুদ্ধের নাম পটগুল্টিশ ওয়ার... 


চমকে উঠে তিনি গুরুগম্তীর গলায় হাঁক দিলেন, “এই কে আছিস, 
আলো আন ।” চাকর ছুটে গিয়ে সিডির আলোটা উক্কিয়ে সামনে 
ধরতেই দেখ! গেল একতাল থলথলে কালোমতন কি জিনিস। ধমক 
দিয়ে বললেন, “এটা আবার কি, কোখেকে এল ?” চাকর কীডুমা 
হয়ে বলল, আজ্ঞে, ছেলেরা কি যেন খেলা করছিল-_” তখন কী 
ভেবে হঠাৎ উপর দিকে তাকিয়ে ছাতের ছিরি দেখেই জ্যেঠামশাই হো। 
হো৷ করে হেসে উঠলেন, আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাচলাম । 

আরেকদিন চোর-পুলিস খেলছি। দাদা হয়েছে পুলিস, আমি 


৬৩ 


চোর। আমার হাতে সাপমুখো৷ বালা ছিল, তার একটার মুখ টেনে 
ফাক করে অন্য বালাটা তার ভিতর দিয়ে গলিয়ে দিব্যি হাতকড়ি 
বানিয়ে দাদ! আমাকে ধরে নিয়ে চলল। ' আমি যেই এক ঝটকায় 
হাত ছাড়াতে গিয়েছি, অমনি নতুন বালা ভেঙে ছঁ-তিন টুকরো হয়ে 
ছাতে ছড়িয়ে পড়ল। টুকরোগুলো কু্তিয়ে মার কাছে নিয়ে গেলাম । 
মা হেসে বললেন, “তোমাকে দেখছি এবার লোহার বালা গড়িয়ে দিতে 
হবে? | 

ক্রিকেট, হুকি প্ররস্থৃতি খেলাতেও “হাতেখড়ি” এ ছাতেই আরম্ভ 
হয়েছিল। আমি একটু “দস্থি” ছিলাম কিনা, দাদাদের সঙ্গে যত সব 





হুড়োহুড়ি খেলায় খুব মজবুত ছিলাম । তেমনি আবার দিদিদের সঙ্গে 
পুতুলখেলাও চমৎকার লাগত । মা সুন্দর করে দোতলা পুতুল-ঘর 
সাজিয়ে দিয়েছিলেন'"'কত ডলি-পুতুল, কাচের পুতুল, মাটির পুতুল, 
ও মাটির কত হাঁড়িকুড়ি হাতাবোড় কত ঘরকন্ন! রান্নাবান্না! ৷ দিদির! 
সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পু'তির গয়না তৈরী করত, পুতুলের বিয়েতে 
ছোট ছোট পাতায় করে ছোট ছোট লুচি-মিটি ইত্যাদি খাওয়] হ'ত। 
একবার পুতুলের বিয়েতে আমরা ফুলপাতা৷ নিশান দিয়ে বিয়েবাড়ি 
সাজিয়ে সারি সারি ছোট্ট ছোট্ট রঙিন মোমবাতি জেলে দিলাম, সবাইকে 


৬১ 


ডেকে দেখালাম, কি স্বম্দর দেখাচ্ছে! তারপর খাবার ডাক পড়তে 
সবাই নিচে চলে গেলাম। খাওয়া সেরে এসে দেখি, পুতুলঘরে দে এক 
অগ্নিকাণ্ড! ছোট মোমবাতি কয়েক মিনিট জলেই শেষ হয়ে গিয়েছে, 
নিশানটিশান পুড়ে এবারে কাঠের ছাত জ্বলতে আরম্ভ করেছে। 
তাড়াতাড়ি জল ঢেলে আগুন নিভানো৷ হল, সির পুতুলগুলো 
বেঁচে গেল। 

আমাদের এক মজার খেলা ছিল দ্রাগ বানানো” হয়তো কারো 
উপর রাগ হয়েছে অথচ তার শোধ দিতে পারছি না, তথন দাদা বলত, 
“আয়, রাগ বানাই!” বলেই সেই লোকটির সম্বন্ধে যা তা অস্তুত 
গল্প বানিয়ে বলতে আরম্ভ করত, আমরাও সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে 
বলতাম । তার মধ্যে বিদ্বেষ কিংব! হিংত্র ভাব কিছু থাকত না, সে 
ব্যক্তির কোনও অনিষ্ট চিস্তা থাকত না, শুধু মজার মজার কথা। যত 
রকম বোকামি হতে পারে, যত রকমে মানুষ নাকাল ও অপ্রস্তত হয়ে 
হাস্তাম্পদ হতে পারে, সব কিছু সেই লোকটির সম্বর্থে কল্পনা করে 
আমরা হেসে কুটিপাটি হতাম। দাদার “হ-য-ব-র-ল” বইয়ের 
'হিজি-বিজ-বিজ৮ যেমন «মনে কর-_» বলে যত রকম সব উন্তট 
কল্পনা করে নিজে নিজেই হেসে দম বন্ধ হবার উপক্রম করে, আমাদেরও 
প্রায় সেই দশাই হু'ত। কিন্তু মজা হ'ত এই যে, হাসির আ্রোতে 
রলাগটাগ নব কোথায় ভেসে যেত-_মনটা আবার বেশ হান্ধা খুশীতে 
ভরে উঠত। 

আর একট। মজার খেল ছিল, কবিতায় গল্প বল! । এ জো 
জান! গল্প নিয়ে একজন প্রথম লাইনটা বানিয়ে বলবে, আরেকজন 
লাইন, এমনি করে ঠল্পটা শেষ করতে হবে। যদি কেউ না পারে সে 
হেরে গেল, তার পরের জন বলবে । থুব জমত এই খেলাটা । বাবা 


৬২. 


কাকারাও এতে যোগ দিতেন। দাদ! কখনও হার মানত না। যত 
শক্ত হোক না৷ কেন চট করে মিলিয়ে দিত। যেমন একদিন হচ্ছে 
“বাঘ ও বক'-এর গল্প-- 

“একদ। এক বাঘের গলায় ফুটেছিল অস্থি 1” 

“যন্ত্রণায় কিছুতেই নাহি ছার স্বস্তি ।” 

“তিন দিন তিন রাত নাহি তার নিদ্রা |" 

“নে ক দেয় তেল মাথে, লাগায় হরিদ্রা--” 
এই রকম চলতে চলতে সুম্দরকাকা যেই বললেন-- 

“ভিতরে ঢুকায়ে দিল দীর্ঘ তার চু ।” 
কেউ আর তার মিল দিতে পারে না। আমরা সবাই পপাস” দিয়ে 
দিলাম, দাদার পাল! আসতেই সে চট করে বলল-_ 

“বক সে চালাক অতি চিকিৎসক-চুধু !” 


আমর! টেঁচামেচি করে উঠলাম, “ওসব যা তা বললে হবে না। 
“চু আবার কি কথা 1” স্ুন্দরকাকা খুশী হয়ে দাদার পিঠ চাপড়ে 
বললেন, « “চুঞ্চু' মানে ওস্তাদ, এক্সপার্ট 1৮ 

ছোটবেলা থেকেই দাদা কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছিল । আট 
বৎসর বয়সে তার প্রথম কবিতা “নদী' আর নয় বৎসর বয়সে দ্বিতীয় 
কবিতা “টিক্‌ টিক্‌ টং, “মুকুল' পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল । 

দাদার দেখাদেখি আমারও শখ হল কবিতা লেখার । একটা 
খাতায় বেশ ফুললতাপাতা একে লুকিয়ে ছুয়েকটা কবিতা 
লিখলাম, তারপর একটা গল্প লিখতে আরম্ভ করলাম । একদিন 
দুপুরে বসে গল্প লিখছি, বাবার কাছে একজন ভদ্রলোক দেখা করতে 
এলেন । তাকে বসিয়ে বাবাকে ডেকে দিলাম, বাবা এসে তারু সঙ্গে 
খানিকক্ষণ গল্পসল্প করলেন, তারপর দুজনে একসঙ্গে কোথায় বেরিয়ে 
গেলেন । আমার খাতাটা টেবিলে ফেলে এসেছিলাম, ওরা চলে 


৬৩ 


যেতেই তাড়াতাড়ি খাতাটা আনতে গিয়ে দেখি, আমার সেই অর্ধেক 
লেখা গল্পটার পাতায় “তারপর হল কি' বলে বাকি গল্পটা সেই ভদ্রলোক 
নিজেই লিখে শেষ করে রেখেছেন । তিনি ছিলেন তখনকার একজন, 
নামকরা লেখক নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত! বড় হয়ে তার লেখা অনেক সুন্দর 
গল্প প্রবাসী'তে পড়েছি । আমার খাতায় তার লেখাটা নিশ্চয়ই খুব 
ভাল হয়েছিল, কিন্ত তখন আমার মনে কি হয়েছিল জান ? মনে হ'ল; 
আমার গল্পটা মাটি হয়ে গেল ! মনের ছুঃখে খাতাটা ছি ডেই ফেললাম। 
বাবা যখন বিদেশে কোথাও যেতেন, মজার মজার ছবি আর পছ্ধে 

আমাদের চিঠি লিখতেন। আমাদের পড় হয়ে গেলে সেগুলি কত 
লোকের হাতে হাতে ঘুরত ৷ সেসব বদি সংগ্রহ করা থাকত, তাহলে 
তাই দিয়ে ভারি মজার একটা বই হতে পারত। তার ছুয়েকটা কিছু 
কিছু মনে পড়ে। মধুপুরে সেই রেলগাড়ির পঞ্টা লিখেছিলেন, ত৷ 
তো আগেই শুনিয়েছি। ময়মনসিংহ শহর থেকে সতীশমামাকে 
ময়মনসিংহী ভাষায় লিখেছেন” 

সৈত্যাঙ্গা? হাঃ-হাঃ-হাঃ। 

কথাড! শুইস্কা যা, 

কৈলকাত। বৈহ্য। খ। 

'দৈ ছানা, খা, পাঠা। 

ময়মনসিং ঘোড়াজ্ডিষ্‌! 

দেখবার নাই বিচ্ছু ভাই, 

সার্ভে ইঙ্, ইস্ট পিড. 

রাইস্ধ্যা থোয় যাইচছা! তাই! 
কোনো। বাড়িতে নিম খেয়ে এসে লিখেছেন-_ 

বাগে! আমার হখলভা, 

টূনী, মনি, খুলী। তাত 

কি ভয়ানক নেমন্তক্স : 


৪ 


১১৪ 


জলে থাকে একট! জন্ত 
দেখতে ভয়ানক কিন্তু ! 
মাছ নয়, কুমীর নয়, 

করাত আছে-_চুতার নর, 
লম্ব৷ লম্বা দাড়ি রাখে, 
লাঠির আগায় চোখ থাকে, 
তার যে কতগুলো পা 

ঢের লোকে তা জানেই না। 
দুটো পা যে ছিল তার 
বাপরে, সেকি বলব আর ! 
চিমটি কাটতে! তা দিয়ে যদি, 
ছিড়ে নিতো! নাক অবধি! 


চিঠিতে জন্তটার একটা ছবিও ছিল। এটা কি জন্তু, বল তো? 


৫1৫ 


ছেলেবেলার মির 


২ নী ৪৮ ছি 
€ ০৩০ 
' পা কিন ৮৬ গু টি 2. টা 


একাদশ পরিচ্ছেদ 

গ্রীষ্মকাল । সেদিন ছিল মহরম । আমরা সারাদিন মেলা ও মিছিল 
দেখে বিকালে জলখাবারের পরে খেলা করছি, হঠাৎ গুম্‌ গুম্‌ শব 
শুরু হল। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ওটা কিসের শব্দ, বাবা ?” 
বাবা একমনে শবট! শুনছেন, এমন সময় মাটি কেঁপে উঠল, ঘরবাড়ি 
ছুলতে লাগল । মা বললেন, “ভূমিকম্প হচ্ছে।” তারপরেই চারদিক 
থেকে রব উঠল, “ভূমিকম্প !” “ভূমিকম্প '” চারদিকে শখ বাজতে 
লাগল আর লোকেরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল । আমরাও 
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পাশের ছোট্ট মাঠটুকুতে গিয়ে াড়ালাম। টুনী 
কাদতে লাগল- তার ডলি-পুতুলকে ফেলে এসেছে । চোখের সামনে 
রাস্তার ওপারের বাড়িটার ছাতের পাঁচিল ভেঙ্গে পড়ল, আর ঠিক সেই 
মুহূর্তে সেইখান দিয়ে পিসীমার আয়া তার ছোট্ট খোকাকে নিয়ে 
হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে “হেই, মামীম৷ !” বলে মা'র পায়ের কাছে 
বসে পড়ল। আমাদের মায়ের উপর তার ভারি ভক্তি, তাই এই 
বিপদে সে মামীমা'র কাছেই আশ্রয় নিতে ছুটে এসেছে। পথে 
হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিল, খোকার কপাল কেটে রক্ত পড়ছে। 
কি ভাগ্যি যে তার গায়ে ইট লাগে নি। 

তারপর আস্তে আস্তে ছুলুনি থেমে সব স্থির হয়ে গেল। আমরা 
আবার বাড়ির ভিতর চলে এলাম । একটু পরেই ঝি কীদতে কাদতে 
এসে খবর দিল-_-“ইস্কুলবাড়ি ভেঙ্গে গিয়েছে, মেয়েরা সব চাপা পড়েছে ।” 


শি মতন তি রদ জু সু ০০০ 


৬? 


' গীদা আর ফাঁকার! তখনই ছুটে গেলেন, খানিক পরে ধিরে এসে 
ধললেন ফে/বাড়ি অনেকটা ভেঙ্গেছে বটে ফিন্তু কেউ চাপা পড়েনি ? 
দাদামশাইরা! তখনও সেই বাড়িতে থাকতেন, তারাও সকলে নিরাপদে 
আছেন। বোডিংয়ের মেয়েরা সদর দরজ। দিয়ে বেরোবার পরমুহুর্তেই 
দোতলার বারান্দা ভেঙ্গে সদর দরজার উপরে পড়েছিল। অল্পের 
জন্য মেয়েরা বেঁচে গিয়েছে । আমাদের বাড়িটা নতুন বলে তার 
কিছুই হয়নি । পরে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম কত জায়গায় কত বাড়ি 
ভেঙ্গেছে, “জোড়া-গির্ভার” ছুটো চুড়োর একট। ভেঙ্গে গিয়েছে । 

দেশ থেকে খবর এল, সেখানে ভূমিকম্প খুবই বেশী হয়েছে, 
আমাদের শহরের দোতলা বাড়িটা ভেঙ্গে একতলা হয়ে 
গিয়েছে । কত জায়গায় মাটি ফুণড়ে গরম জলের ফোযারা উঠেছে, 
কোথাও নিচু জমি উচু হয়ে উঠেছে, আবার কোথাও 
উচু জমি নিচু হয়ে গিয়েছে। এক জায়গায় প্রজাদের জলকষ্ট ছিল 
বলে অল্পদিন আগেই বাবা সেখানে মস্ত একটা পুকুর কাটিয়ে 
দিয়েছিলেন, সুন্দর পরিফষার জল থে-ঘৈ করছিল । ভূমিকম্পের পর 
দেখ! গেল- কোথায় জল? শুকনে৷ বালি ধুধু করছে । শিলংয়ে 
আরো! ভয়ানক কাণ্ড] আমাদের আতীয় একজনরা সেখানে ছিলেন, 
তারা সকলেই বাড়িচাপা পড়েছিলেন, তাদের ছোট্ট মেয়েটি মারা 
গিয়েছিল । শহরের কত বাড়ি ভেঙ্সেছিল, অনেক লোক মরেছিল। 

আমাদের স্কুল তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেল। ছুটির পরে যখন 
খুলল, তখন স্কুলবাড়ি মেরামত হয়ে গিয়েছে, ভূমিকম্পের আর 
কোনে! চিহ্ন নেই। শুধু আমাদের র্লাসের পাগলা শু-_+ পড়ার 
মাঝখানেই মাঝে মাঝে হঠাৎ লাফিয়ে টেঁচিয়ে উঠত-_- “ভয়ঙ্কর 
ভূমিক-ম্-পো""' দেখেশুনে হৃৎক-মৃ-পো""” 

মাথাপাগলা বলে তাঁকে কেউ কিছু বলতেন না । 


৬৮ 


ভুমিকম্পের পরে এল প্লেগ। এ-র়োগটা আগে আগাদের দেশে 
ছিল না, বোধ হয় বিদেশ থেকে জাহাজে কোনো রোগী এটা 
এনেছিল। প্রথমে বোশ্বাইয়ে দেখা দিল, তারপর ক্রমে ছড়াতে 
ছড়াতে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে এগিয়ে চলল। কত শহর গ্রাম 
উজাড় হয়ে গেল, হাজার হাজার লোক মারা গেল, বাকি সব ভয়ে 
ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেল। নতুন রোগ, এর চিকিৎসা! কেউ তখন 
জানে না, কি করে এ রোগ এড়ান যায় তাও জানে না। প্লেগ যতই 
কলকাতার দিকে এগিয়ে আসছে, ততই লোকের ভয় বাড়ছে। সে 
কী ভীষণ ভয়! দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যেমন বোমার ভয়ে লোক 
পালিয়েছিল, তেমনি প্লেগের ভয়ে “ছু'দিনে ছু'লক্ষ লোক” কলকাতা 
ছেড়ে পালিয়ে গেল । 

আমরাও জ্যেঠামশাই পিসীমা ও কাকাদের সঙ্গে প্রকাণ্ড দল বেঁধে 
দেশে পালালাম। স্টেশনে, ট্রেনে কী অসম্ভব ভিড়! আবার 
জাহাজে উঠে সে কী ভীষণ ঝড়! লোকে বলছে, “এইবার জাহাজ 
ডুববে” আমরা ছুটে বাবার কাছে যাচ্ছি__বাবা আমাদের আশ্বাস 
দিচ্ছেন, এমনি করতে করতে শেষ পর্যস্ত যা হোক নিরাপদেই ওপারে 
পৌছান গেল । 

বাবার ময়মনসিংহ শহরে কি কাজ ছিল, আমাদের সঙ্গে নিয়ে 
গেলেন। ব্রহ্মপুত্র নদীর ধারে ছোটখাটো শহরটি, নদীর ধারটা বেশ 
সুন্দর লাগত | বাব প্রায়ই দাদাদের সঙ্গে নিয়ে নদীতে স্নান করতে 
যেতেন, আমিও মাঝে মাঝে সঙ্গে যেতাম । এখানে এখনো ভূমিকম্পের 
চিহ্ন চারিদিকে দেখা যাচ্ছে । আমাদের বাড়িতে মিন্ত্রীর কাজ তখনও 
শেষ হয়নি। বুড়ো দর্দার-মিস্ত্রীর দাড়ি দেখেই “সখাই' মনে, করে 
নানকু ঝাঁপিয়ে তার কোলে গেল। আমাদের বাড়ির সামনেই মহারাজ 
হুর্যকান্তের প্রকাণ্ড প্রাসাদ ছিল। আয়নায় মোড়৷ ছিল তাঁর ঘরের 


৬৯ 


দেয়াল, সোফা-চেয়ার-টেবিলের পায়া, সি'ড়ির রেলিং, সব সুন্দর 
ফুলকাটা কীচের তৈরী ছিল, তাই লোকে সেটাকে বলতো কৃষ্ট্যাল 
প্যালেস' ৷ ভূমিকম্পে সে স্ষটিক-প্রাসাদ গু'ড়ে৷ হয়ে গিয়েছে, পাহাড়ের 
মত পড়ে রয়েছে তার ধ্বংসম্ভূপ। পাড়ার ছেলেপিলেদের কাছে সেটা 
ছিল '“রত্ব-থনি'। কত সুন্দর রঙ্গীন, ফুলকাটা, পল্কাটা কাচের 
টকুরো তার সেই স্তূপের মধ্যে থেকে কুড়িয়ে হীরে মানিকের মত 
আদর করে নিয়ে আসত । 

আমাদের বাড়ির পিছনে, খিড়কী পুকুরের ওপারে, কার্দের একটা 
পৌড়ো৷ জমি ছিল । লতায় পাতায় জড়ান বড় বড় গাছ, তার নীচে 
কাটাঝোপ । শেয়াল, হনুমান, বড় জোর ছু'চারটা সাপখোপ, তার বেশী 
কিছু হয়ত সেখানে ছিল না। দাদারা কিন্তু এপার থেকেই খেলার 
বন্দুক দিয়ে তার মধ্যে হাতি-বাঘ-গণ্ডার অনেক কিছুই কল্পনায় 
শিকার করত। একদিন সেই জঙ্গলের মধ্যে বন্দুকের আওয়াজ 
শুনে আমরা ভাবলাম সত্যিই বুঝি কেউ কিছু শিকার করছে। 
তারপর শুনলাম যে, ওগুলো বন্দুক নয়-__“গিলা' ফাটছে। গিলা- 
গাছের প্রকাণ্ড শিমের মত দেখতে ফল হয়, পাকলে পরে সেগুলো 
বন্দুক্ষের মত জোরে ফট্টাস্‌ করে ফাটে আর তার বড় বড় চ্যাপ্টা 
চকোলেট রঙের বীচিগুলে! অনেক দূর পর্যন্ত চারদিকে ছিটকে পড়ে । 
চাদর জামা কুঁচিয়ে দিত। ধনকাকা এ রকম "গিলে-করা' জামাকাপড় 
পছন্দ করতেন। 

ছুটির পরে যখন ফিরলাম তখন কলকাতায় প্লেগ এসে গিয়েছে। 
বড় হুঁছুর থেকে প্লেগের বীজাণু ছড়ায় সে খবর জানা গিয়েছে, তাই 
চারিদিকে ইছ্র মারার ধুম চলেছে। প্লেগের টিকেও ততদিনে বেরিয়েছে, 
কিন্ত ভাও কেউ ভয়ে নিতে চায় না। তখনকার দিনে প্লেগের ইন্জেকৃশন 


৭ 


নিলে খুব ব্যথা হত, হাত ফুলে জ্বর হত। তাই গুজব রটে গেল যে, 
টিকা না নিলে যদি বা রক্ষা আছে, টিকা নিলে আর রক্ষা নেই, নির্ঘাৎ 
প্লেগ হবে। লোকের মনের এই ভূল ধারণা ভাঙ্গবার জন্য আমাদের 
দাদামশাই তার আত্মীয়ন্বজন বন্ধুবান্ধব সবাইকে অনুরোধ করলেন 
প্লেগের টিকা নেবার জন্য । আমরা শ্রায় আড়াই শ লোক ছোট বড় 
ছেলে মেয়ে সব জড়ে। হয়ে স্কুলবাড়িতে একসঙ্গে টিকা নিলাম আর 
সেই খবরটা সমস্ত সংবাদপত্রে ছাপান হল, যাতে লোকের মনের ভয় 
ভেঙ্গে যায়। 

এর কিছুদিন পরে দাদামশাইর খুব অস্্রখ হল। সবাই খুব ব্যস্ত, 
বাবা-মা ক্রমাগত ও-বাড়িতে যাওয়া-আস! করছেন। হঠাৎ একদিন 
গভীর রাত্রে সখাওয়াৎ আলী ছুটে এল, তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। 
বাবাকে বলল, “বাবু, সব শেষ!” বাবা আন্তে আন্তে বললেন, 
“খোদার ইচ্ছাই পুর্ণ হোক ।৮ বুঝলাম, দাদামশাই আর বেঁচে নেই। 

দাদামশাই নানা কাজে এত ব্যস্ত থাকতেন যে আমর! তার কাছে 
ধেঁষবার অবসর বেশী পেতাম না । মাঝে মাঝে গাড়ি করে আমাদের 
গড়ের মাঠে ও গঙ্গার ধারে বেড়াতে নিয়ে যেতেন, তখন তার সঙ্গে 
বেশ হাসি গল্প হ'ত। সবাই বলতেন যে অতিরিক্ত পবিশ্রমেই 
দাদামশাইর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিল। সারাজীবন তিনি দেশ ও 
সমাজের সেবায়, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা ও কল্যাণের জন্য, অক্লান্ত 
চেষ্টা ও পরিশ্রম করেছিলেন । তখন ছোট ছিলাম, সেসব কাজের 
মূল্য তো ভাল করে বুঝতাম না, কিন্তু তার সাহস ও গায়ের জোরের 
কথা, বিশেষ করে “সাহেব ঠ্যাঙ্গানো"র গল্প শুনতে খুব ভাল লাগত । 

তখনকার দিনে আসামের চা-বাগানে যারা মজুরী করতে যেত, 
তাদের ভারি ছুরবস্থা ছিল। তাদের অনেক সময়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে 
ঠকিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। সেখানে তাদের উপর নানারকম অত্যাচার 


১ 


হত, সেখান থেকে পালিয়েও আসতে পারতো না। এই নিয়ে দেশে 
বেশ একটা আন্দোলন হয়েছিল, যার ফলে তাদের অবস্থার অনেক 
উন্নতি হল। এই আন্দোলনের সময় দাদামশাই নিজে “কুলী' সেজে, 
বাগানে বাগানে দ্বুরে, মজুরদের দশ! ব্বচক্ষে দেখে, খবরের কাগজে 
সেসব কথ! প্রকাশ করেছিলেন । এতে কোনো কোনো বাগানের 
অত্যাচারী কর্তারা ভয়ানক রেগে গিয়ে তাকে ধরবার ও ভাড়াবার 
নানারকম চেষ্টা করেছিল, খুন করবার চেষ্টা করতেও ছাড়েনি । কিন্তু 
তিনি তাতে ভয় না পেয়ে, সব বাধা বিপদের মধ্যেও নিজের কর্তব্য 
সেরে এসেছিলেন । | 

সাহেবদের সে সময়ে খুব প্রতাপ ছিল, সাধারণ লোকে তারের 
ভয় করে চলত । ভাল সাহেবও অবিশ্যি অনেক ছিল, আবার অনেকেই 
“কাল আদমিদের অবজ্ঞার চোখে দেখত, তাদের সঙ্গে নানারকম 
থারাপ ব্যবহার করত । কেউ তাদের কিছু বলতে সাহস করত না। 
দাদামশাই ভারি তেজী মানুষ ছিলেন, অন্যায় কিছুতেই সইতে পারতেন 
না। কোথাও হূর্বলের উপর অত্যাচার হতে দেখলেই তাকে রক্ষা 
করতে এগিয়ে যেতেন । ভাল কথায় তো সব সময়ে কাজ হয় না, 
অনেক সময় তাকে হাতাহাতি মারামারিও করতে হয়েছে, কিন্তু সাহস 
ও গায়ের জোরে তাঁরই জয় হয়েছে । কোথায় কোন ছুষ্ট সাহেব 
গরীবের জিনিষ কেড়ে নিচ্ছে দেখলেই, তাকে উচিত দাম দিতে কিন্বা 
জিনিষ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেছেন ; নিরীহ ভদ্রলোককে অপমান 
করতে দেখে ক্ষম! চাইতে বাধ্য করেছেন, কেমন করে ছাতা হাতে 
তিনি একাই কয়েকজনের সঙ্গে লড়াই করেছেন, তারপর তার! হেরে 
গিয়ে হাগ্ুশেক করতে এলে হাত গুটিয়ে নিয়ে বলেছেন--“আই 
ডোণ্ট, শেক্‌ হযাগ্স্‌ উইথ. কাওয়ার্ড স্‌”, লোকের মুখে এই সব গল্প 
শুনে আমরা বেশ আনন্দ আর গর্ব বোধ করতাম । 


৭২ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





| দ্বাদশ, পরিচ্ছেদ, ৯ 7 
আমাদের বাড়িতে সর্ধদাই অভিথি সমাগম হত। এমন সময় খুব 
কম যেত যখন বাড়িতে একটিও উপরি লোক নেই। একবার একজন 
ফরাসী মেম কিছুদিন আমাদের বাড়িতে রইলেন। বাবার চেনা 
একজন আর্টিস্টের সঙ্গে এ'র বিয়ে ঠিক হয়েছে । এদেশে তো এ'র 
আত্মীয় কেউ নেই, তাই আমাদের বাড়ি থেকে বিয়ে হল। মেমসাহেব 
বেশ হাসিখুশী আর আধো-আধো করে ভাঙ্গাভাঙ্গ ইংরেজী বলেন, 
দেখে আমাদের ভরসা হল । আমরাও তো! তখন ভালো করে ইংরেজী 
বলতে শিখিনি ! মেমসাহেবকে তার ঘরে বসিয়ে, মা বারান্দায় 
আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন, হঠাৎ মেম ছুটে গিয়ে মা'র গলা জড়িয়ে 
ধরে সরু গলায় কাতর স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন-_৫বীস্ত, 1” “বীস্ত. 1” 
দোতলার ওপরে আবার “বীস্ট্‌” কিরে বাবা ! আমরা তো৷ অবাক হয়ে 
এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, তখন মেমসাহেব আঙুল দিয়ে দেখিয়ে 
দিলেন-_ঘরের দেয়ালে একটা টিকটিকি! বিলেতের লোকেদের 
অনেকের মনে ধারণ! থাকে যে: ইপ্ডিয়ানরা সবাই বুঝি বেজায় 
বড়লোক হয়। আমাদের খাবার ঘরে ঢুকে এতগুলি লোকের 
সারি সারি কীসার থালা-বাটি, রেকাব-গেলাস দেখেই মেমসাহেব 
একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, “ইজ. ইত. অল্‌ গোল্দ্‌ ?” 

_. বাবার এই বন্ধু আমাদের ছু'জোড়া খরগোশ দিয়েছিলেন ৷ ধবধবে 
সাদা রং লাল কাচের মত চোখ, ঠোট নাক আর লম্বা কানের ভিতর 


৭৩ 


দিকট! গোলাপী, ভারি স্বন্দর । প্রথমে আমাদের দেখে ভয় পেত, 
পরে হাত থেকে ঘাস, ছোলা ইত্যাদি খেত । পানের বোঁটা খেতে খুব 
ভালবাসতো । ওদের গলায় রিবন দিয়ে ঘুঙর বেঁধে দেওয়া হল। 
খরগোশের যখন বাচ্চা হল, নীচের একটা ঘরে ওদের বন্ধ করে রাখ। 
হল। সকালে উঠে দেখি, পিছন দিকের জানালা ফাক করে 
আমাদের বেড়ালটা কখন ঢুকে কয়েকটা! ছানাকে খেয়েছে আর বাকি 
লোকে মেরে রেখেছে। | 

এই বেড়ালটাকে কয়েক মাস আগে বৃষ্টিতে ভিজে কাদা মেখে 


সি 


| (৯০9 | 
হি | 





“*এ্বীস্ত!” প্বীন্ত 1” দোতলার ওপরে আবার “বীস্ট»..* 


মিউ-মিউ করে কেঁদে বেড়াতে দেখে মনি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিল। 
তখন ছোট্ট ছিল, স্্ান করিয়ে দেওয়াতে বেশ পরিফার হল আর 
খেয়েদেয়ে যত্ব পেয়ে দেখতে দেখতে বেশ বড় হয়ে গেল। বেড়ালের 
কীতি দেখে আমাদের ভয়ানক রাগ আর হুঃখ হল । ওকে সবচেয়ে 
কঠিন,কি শান্তি দেওয়া যায়, সেই পরামর্শই চ্শল। কেউ বলল, 
“ওকে দূর করে তাড়িয়ে দাও ।” কেউ বলল, «খুন করেছে, হয় ফাসি 
দাও নয়তো গলা কেটে দাও ।” কেউ বা আবার বঙ্গল, “গলা যদি 


ণ্ 


কাটো, তাহলে তক্ষুনি ছাই-চাপা দিতে হবে কিন্তু 1” ( কথাটা কার 
কাছে শুনেছিলাম মনে নেই, কিস্তু তখন আমাদের মনে বিশ্বাস ছিল 
যে, বেড়ালের গল৷ কেটে তক্ষুনি ছাই-চাপা দিয়ে দিলে কাটা গলা 
আবার জোড়া লেগে যায়।) মনিরও তাই মত, কারণ বেড়ালটা 
তারই । দাদা! কিন্তু বলল, *না, ওসব শান্তি দিতে পারবে না। ও 
কী বোঝে? মরা বাচ্চাগুলো দেখিয়ে ওকে বেশ করে পিটি দিয়ে 
দাও, তাহলেই আর কখনও এরকম করবে ন11” এরকম গুরু পাপে 
লঘু দণ্ড আমাদের পছন্দ হল না। বাবার কাছে বিচারের জন্য গেলাম । 
বাবাও বললেন, «ও তো জানে না, ওর খাদ্য ও পেয়েছে তাই খেয়েছে । 
আমাদেরই আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল, যাতে ও নাগাল ন৷ 
পায় ।” . 

এর পরের বার যখন খরগোশের বাচ্চা হল, তখন খুব যত 
করে সাবধানে রাখলাম ।- প্রথমে ইছুরছানার মত বিশ্রী শ্যাড়৷ ছিল, 
তারপর যখন লাল পুঁতির মত চোখ ফুটল আর ফুরফুরে নরম লোম 
গজাল, কী স্বন্বর যে দেখতে হল। একেবারে আট-দশটা করে বাচ্চা 
হত, কত লোকে চেয়ে নিত। প্লেগ আসবার পরে ডাক্তাররা বললেন 
কি, «খরগোশ বাড়ির মধ্যে রাখা উচিত নয়। ইছ্বরের মত ওরাও 
প্লেগ আনতে পারে ।” সেই সময়ে আমাদের পরিচিত একজন খরগোশ 
চেয়ে নিলেন । তাদের শহরের বাইরে অনেক জমি আছে, বাড়ি 
থেকে দূরে খরগোশ পুষতে পারবেন । 

এবার আমর! পড়ার ঘরের বারান্দায় মাটির টবের মধ্যে লাল মাছ 
পুষলাম। জলের ভিতর শামুক-ঝিহ্ৃক, হুড়ি-পাথর, বাঁজি-শ্যাওলা 
সাজিরে দিলাম। মেছুনী পুকুর থেকে টাটকা বাঁজি এনে দিত । 
রোজ খাবার দিতাম, জল বদলিয়ে দিতাম, দেখতে দেখত্তে বেশ বড় 
হয়ে উঠল মাছগুলো । এই সময়ে আমাদের স্কুল সেই বড় বাড়িটা 


ণ& 


ছেড়ে একটা বাগানবাড়িতে উঠে গেল। বাগানের মাঝখানে একটা 
ফোয়ারা ছিল, এখন তার মুখটা ভেঙ্গে গিয়েছে, কিন্ত মন্ত্র গোল 
চৌবাচ্চাটা রয়েছে। তার মধ্যে লাল মাছ দেওয়া হল। আমরাও একদিন 
আমাদের মাছগুলোকে বোতলে ভরে নিয়ে গিয়ে সেই চৌবাচ্চায় ছেড়ে 
দিলাম বেশী জলের মধ্যে বেশ আরামে থাকবে বলে। রোজ স্কুলে 
পৌছে গাড়ি থেকে নেমেই আগে ছুটে যাই মাছ দেখতে । আমাদের 
মাছগুলে৷ অনেক বড় কিনাঃ দেখেই চিনতে পারি। একদিন দেখি 
ছেলেমেয়েরা চেঁচামেচি করছে, “জলে ভীষণ পোকা কিলবিল করছে-_- 
মালীরা একদিনও জল বদলায় না” আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, 
পোকাগুলো, ঠিক ক্ষুদে ক্ষুদে কালো মাছের মত দেখতে । বললাম, 
“না, পোকা নয়, বোধ হয় মাছের বাচ্চা ।” কেউ আমার কথা বিশ্বাস 
করল না, উল্টে আমাকে ঠাট্র! করতে লাগল। হেভমিস্ট্রেস পর্যস্ত 
এসে দেখে হেসেই উড়িয়ে দিলেন। আমার মনে মনে ভারি রাগ 
হল। বিকালে বাবা কি কাজে যেন স্কুলে গিয়েছিলেন, তাকে ডেকে 
নিয়ে দেখালাম । বাবা! দেখেই বললেন, “হ্যা, এগুলো মাছের বাচ্চা 1” : 
তখন আমাদের স্ফূতি দেখে কে। ক্রমে বাচ্চাগুলো৷ বড় হল। 
প্রথমে.ছাই রং, তারপর গোলাগী, শেষে লাল রং হল। ঝাঁকে বাঁকে 
মাছ সাতার কেটে বেড়াচ্ছে, এমন শ্ুন্দর লাগত দেখতে ! আমরা 
কত সময় অন্য খেলা ফেলে চৌবাচ্চা ঘিরে পাড়িয়ে মাছের খেলা 
দেখতাম । কিছুদিন পরে মনে হল যেন মাছ ক্রমে কমে যাচ্ছে । 
কমতে কমতে যখন প্রায় অর্ধেক হয়ে এল, তখন আমরা খুব 
চেঁচামেচি করাতে মালীর৷ জলে নামল। চৌবাচ্চার মধ্যে থেকে 
বেরোল এই বড় বড় মোটা মোটা ছুই কোলাব্যাঙড। এ রাক্ষস 
হটোই সব মাছ খেয়ে শেষ করছিল । | 

এবার এল ছোট্ট একট! কচ্ছপ.। চার-পাঁচ আঙ,লের বেশী 


ণ্ঠ 


লম্বা হবে নী, পিঠটা . ব্রাউন আর তলার দিকটা ব্রাউনে-গেরুয়াতে 
স্্দর চিত্র-বিচিত্র করা । ও নাকি বয়েসে বাড়লেও আয়তনে আর 
বাড়বে না, এ রকমই ছোট্ট জাত। ভয় পেলেই মাথা-পা সব গুটিয়ে 
ভিতরে ঢুকিয়ে নিত, আবার একটু পরে গলা বার করে কালো 
পুঁতির মত গোল গোল চোখ দিয় দেখত, কুর্কুর্‌ করে হাটত। 
ওকে আমরা সেই মাটির গামলায় জল দিয়ে ঝিনুক পাথর সাজিয়ে 
দিলাম, জলের মধ্যে একটা ছোট বাক্স খাড়া করে গুহা বানিয়ে 
দিলাম । গামলার উপর একটা তক্তা আড়ভাবে ব্রীজের মত করে 
দিয়ে আরেকটা তক্তা তার উপর থেকে ঢালু করে জলে নামিয়ে 


দাত্খ। ডাকছে, 
“জঞ্জাল! জঞ্জাল!” 
কিন্ত 

সেআর আসেনা। 
ব্যাপার কি ?.. 
কোন অদৃশ্য হস্ত 
ওর ঝুঁটি 

পাকড়ে ধরল ! 





দিলাম। সেই ঢালু তক্তা বেয়ে ব্রীজের উপর উঠে রোদ পোহাত 
আর গুহার মধ্যে ঢুকে ঘুমাত । 

বেশ ছিল, হঠাৎ একদিন সকালে উঠে দেখি, রাত্রে কে ওকে 
বাক্সটা উপুড় করে চাপা দিয়ে তাঁর উপরে পাথরগুলো চাপিয়ে দিয়েছে, 
বেচারা দমবন্ধ হয়ে মরে রয়েছে । “কে করলো 1” “কে করলো $” 
খোঁজ করে জানা গেল যে, একজন নতুন চাকর ; নাম জঞ্জাল; 
কাজেও জঞ্জাল! তারই এই কাজ। তাকে জিজ্ঞাসা করা 
হল) “কি করেছ, দেখ ত? কেন এমন করলে 1 সে কাদো-কাদে। 


৭৭ 


হয়ে হিন্দী-বাংলায় বলল, *হামি ভাবলুম কি বিলাড়ি উলাড়ি খাইয়ে 
যাইবে, ভাই-সে আচ্ছা! কর্‌কে ঢাকিয়ে রাখলুম 1” এমন বোকা 
লোককে নিয়ে কী করা যায়? মনে পড়ে গেল পাড়ার সেই ভদ্রমহিলার 
কথা । তিনি আমাদের লাল মাছ দেখে বলেছিলেন, “হ্যা, আমার 
ছেলেও এই রকম মাছ এনেছিল, রাত্ত্িরে পাছে বেড়ালে খেয়ে যায়, 
তাই বেশ করে বোতলে ছিপি এটে রাখলাম । ওমা! সকালে 
উঠে দেখি স-ব কট মরে রয়েছে ।” 

দাদা কি কাজে ডাকছে, প্জঞ্াল! জঞ্জাল!” কাছেই 
কোথাও থেকে ক্ষীণ স্বরে উত্তর আসছে, প্যাই । যাই!” কিন্ত 
সেআর আসে না। ব্যাপার কি? ঘর থেকে বেরিয়ে দেখ! গেল 
বারান্দার দড়িতে জামাকাপড শুকোচ্ছিল, দৌড়ে আসতে আসতে 
তাবই একটার হুকে ওর শ্ুপুষ্ট টিকিটি আটকে গিয়েছে । বেচাব৷ 
হতভম্ব হয়ে ঠাড়িয়ে ভাবছে-__কোন্‌ অদৃশ্য হস্ত ওর ঝুঁটি পাকডে 
ধরল । ভয়ে হাত দিয়ে দেখবার চেষ্টা পর্যস্ত করছে না। 


৭৮ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ 


হাফটোন্‌ ছবি ছাপার প্রণালী নিজের চেষ্টায় শিখে নিয়ে বাবা 
কয়েকটি লোককে শিখিয়ে তৈরী করে নিলেন, তারপর আমাদের 
দেশে উচ্চশ্রেণীর ছবি ছাপার জন্য ভালরকম আয়োজন করলেন । 
এবার আমরা আরো বড় একটা বাড়িতে উঠে এলাম। এখানে 
তিনতলার উপরে কাচের ছাতওয়ালা হুন্দর স্টুড়িয়ো তৈরী হল। 
মেঘলাদিনে অথব৷ রাত্রে সুর্যের আলোর কাজ চালাবার জন্য প্রকাণ্ড 
প্রকাণ্ড আর্ক-ল্যাম্প এল, নতুন ক্যামেরা, প্রেস এবং আরো অনেক 
যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম এল । বিস্তর টাকা খরচ করে বিপুল উৎসাঁহের 
পক্ষে কাজ আরম হল |. 
_ অল্পদিনের মধ্যেই বাবার এই প্রতিষ্ঠান_-“ইউ রায় এণ্ড সন্স” 
আমাদের দেশে সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান বলে বিখ্যাত হ'ল। এ 
বিষয়ে গবেষণ! করে বাবা! হাফ টোন ছবি সম্বন্ধে কতগুলি নতুন তথ্য 
আবিকষার করলেন এবং সেগুলি বিলেতে কোনও প্রসিদ্ধ কাগজে 
প্রকাশ করে ওদেশেও অনেক প্রশংসা পেলেন। দাদা বড় হয়ে যখন 
বিলেতে গিয়েছিলেন, তখন দেখেছিলেন, লগ্ডনের কোনও প্রসিদ্ধ 
স্টূডিয়োতে বাবার পরিকল্পিত যন্ত্র দিয়ে তার উদ্ভাবিত প্রণালীতে 
কাজ হচ্ছে। | 

এই সব কাজ নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, বাব৷ তার সবচেয়ে 


৭৬ 


শ্রিয় কাজ ছবি আকা ও গানবাজনা কোনোদিনই ভৌলেন নি। 
ছোট্টবেলার ঝাপসা স্মৃতির মধ্যেও বাবার ছুটি মুর্তি মনে জাগে : 
রং তুলি নিয়ে বাবা ছবি জাকছেন আর বাব! বেহালা বাজাচ্ছেন । 
কি সুন্দর কত রকমের ছবির পর ছবিই যে তিনি আকতেন। 
বিশেষ করে প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি জাকতে তার সমকক্ষ খুব কমই 
দেখতে পাওয়া যেত । 

আমাদেরও বাবা! ছোটবেলা থেকেই ছবি আকতে উৎসাহ দিতেন । 
আকবার সরঞ্জাম এনে দিতেন, আমরা নিজেদের মনের মতন যার য৷ 
ইচ্ছা ছবি আকতাম, বাব! দেখে যেটুকু ভাল হয়েছে তার প্রশংসা 
করতেন, আর দোষ ক্রটি যা থাকত তাও সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন । 
দিদি, দাদা আর টুনীর ছবি আকার হাত খুব সুম্দর ছিল । দিদি ফুল- 
পাতা, পাখি, গাছপালা! ইত্যাদি সুন্দর জিনিষের ছবি আকতে 
ভালবাসত, আর দাদার প্রধান ঝোঁক ছিল মজার ছবির উপর | দাদার 
বই খাত! কত মজার মজার ছবিতে ভরা থাকত, পড়ার বইয়ের সাদা- 
কালো ছবিগুলি সব রঙ্গীন হয়ে যেত। 

একবার আমরা তিনজনে টবে ফুলগাছ লাগালাম । দিদি আর 
স্রম্মমাসীর গাছে কি সুন্দর নীল রঙ্গের ফুল ফুটল, আর আমার গাছে 
সাদ! কু'ড়ি ধরল দেখে আমার ভারি ছুঃখ হল । পরদিন সকালে উঠে 
দেখি, আমার গাছে ওদের চেয়েও সুন্দর নানা রঙ্গের ফুল ফুটেছে। 
আমার তো আনন্দ ধরে না। অনেকক্ষণ পরে মেজেতে রঙ্গের ছিটা 
দেখে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম যে, ওগুলো আসলে রঙ্গীন ফুল নয়, 
কোন ভোরে উঠে দাদা রং তুলি নিয়ে আমার সাদা ফুলগুলোকে 
রঙ্গিয়ে দিয়ে গিয়েছে। 

নানারকম বাজনা বাবা ভাল বাজাতে পারতেন। সেতার, 
পাখোয়াজ, হার্মোনিয়াম, বাঁশী, বেহালা । তার মধ্যে বেহাল! ভার 


৮৩ 


বেহালাখানি হাতে তুলে নিলে তিনি আর সব. ভুলে গিয়ে- একেবারে 
তন্ময় হয়ে বাজিয়ে চলতেন, লোকে মুগ্ধ হয়ে শুনত। একবার দিদির 
খুব অন্বখ হয়েছিল । যন্ত্রণায় কিছুতেই ঘ্বম হত না, ঘুমের ওষুধেও, 
কাজ হত না। কিন্তু বাবা যখন পাশে বসে বেহালা বাজাতেন তখন 
সে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত । চিরজীবন বেহালাখানি তার নিত্যসঙগী 
ছিল। শেষ জীবনে রোগশয্যায়ও প্রতিদিন উঠে বসে বেহালা 
বাজাতেন, বাজাতে বাজাতে রোগধন্ত্রণা সংসারের নানা ভাবনা চিন্তা 
সমস্ত ভুলে যেতেন । 

ছবি আকা ও গান বাজনার ঝোক নাকি বাবার ছেলেবেলা 
থেকেই ছিল। যখন ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে পড়তেন, একদিন বাংলার 
ছোটলাট তাদের স্কুল দেখতে এলেন । বাবাদের ক্লাসে ঢুকে সাহেব 
হঠাৎ লক্ষ্য করলেন যে, বাব! মাথ! নীচু করে একমনে খাতা পেন্সিল 
নিয়ে কি করছেন। চট্ট করে খাতাটা চেয়ে নিয়ে দেখলেন যে, এই 
কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাব! সাহেবের বেশ সুন্দর একটা ছবি একে 
ফেলেছেন । শিক্ষকমশাইরা তো ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, না জানি সাহেব 
কি মনে করবেন! সাহেব কিন্তু ভারি খুশী হয়ে বাবার পিঠ চাপড়ে 
বললেন, “এ জিনিসের চর্চা তুমি কখনও ছেড়ে নাঃ বড় হয়ে তুমি এই 
লাইনেই যেয়ো |” 

এণ্টান্স পরীক্ষার অল্প আগে, নতুন বেহালা কিনে বাব! তাই নিয়েই 
ভুলে রইলেন, পড়াশোনার দিকে একেবারেই খেয়াল রইল না। শেষে 
প্রধান শিক্ষকমশাই একদিন তাকে ডেকে নিয়ে বললেন, “তোমার 
উপর আমরা অনেক আশা রাখি, তুমি আমাদের নিরাশ করো না।” 
সেই দিনই বাড়ি এসে সাধের বেহালাখানি ভেঙ্গে ফেলে বাবা পড়ায় 
মন দিলেন । 


৮৯ 
৬1৫ 


প্রথম 'বিভাগে পাশ করে বৃর্তি পেয়ে তিনি কলকাতায় পড়তে 
এলেন এবং যথাসময়ে প্রেমিডেন্পী কলেজ থেকে বি. এ, পাশ করে 
বেরলেন।. কলেজে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মহাশয় তার সহপাঠী 
ছিলেম। বাশার কাছে শুনেছি, আস্উভোষের “নোটস্‌' এমম চমৎকার 
ছিল যে, তার জন্য ছেলের! তাকে ভারি জ্বালাতন করত। ক্রমাগত 
চেয়ে নিয়ে যেত, তার নিজের দরকারের সময় ভিনি পেতেন মা, তাই 
চুপিচুপি বাবার কাছে তিনি নোটের খাতা রেখে দিয়ে বলতেন, “তুমি 
তো৷ এ সব পড় না বলেই সবাই জানে, তোমার কাছে থাকলে কেউ 
খোঁজ পাবে না” বাস্তবিক কলেজের পড়ার বইয়ের চেয়ে গান বাজনা 
ও ছবি আকার দিকেই বাবার বেশী ঝোঁক ছিল । কলকাতায় এসে 
সে সব চর্চার শ্বযোগও তিনি পেলেন। 

ভাল ওত্তাদের কাছে তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা করতেন, ব্রহ্ম- 
সঙ্গীত তার অতি প্রিয় ছিল। তিনি নিজেও কতগুলি শ্ুন্দর সঙ্গীত 
রচনা! করেছিলেন । আজও তার “জাগো পুরবাসি ।” গানটি দিয়ে প্রতি 
বৎসর আমাদের মন্দিরে মাঘোৎসবের উপাসনা আরম্ভ হয়, খুস্টানদের 
ধর্মোৎসবেও এই গানটি হতে শুনেছি। ছোটদের জন্যও তিনি 
অনেক মুন্নর সুন্দর গান লিখে গিয়েছেন । - 

বড় বড় সভা-সমিতি ও সঙ্গীত-সম্মেলনে যেমন তার গান বাজনার 
আদর ছিল, তেমনি ছোটখাটো নানা অনুষ্ঠানেও তাঁকে অনুরোধ করে 
কেউ কোনোদিন নিরাশ হত না। গান বাজনায় নিজে যেমন আনন্দ 
পেতেন, গান বাজনা শোনাতে আর শেখাতেও তার তেমনি আনন্দ 
ছিল। এ বিষয়ে কখনও তার ক্লাস্তি-বিরক্তি ছিল না। 

আমাদের রোজ নিয়মমত বাবা গান বাজনা! শেখাতেন, তাছাড়া 
কত যে তীর ছাত্রছাত্রী এসে জুটতে৷! তার উপরে ছিল মন্দিরে 
উৎসবের গান, স্কুলের প্রাইজের গান, কত বিয়ে ও সভা-সমিতির গান । 


৮ 


একেক সময়ে বাড়িটাই যেন গানের স্কুল হয়ে ফেত। বেশ মনে পড়ে, 
শীতকাল সন্ধায়-নন্ধ্যায় খেয়ে আর! লেপের মধ্যে শুয়ে পড়েছি। 
ওদিকে পড়বার ঘরে ভখন অনেক লোক জড়ো হয়ে কংগ্রেসেয় গাঁন 
রিহাল দিচ্ছে। “চল রে চল সবে ভারতসম্তান' । সক্ষে অর্যান 
বাজছে; বেছালা বাজছে, সারা বাড়িটা যেন গমগম করছে। বিছানায় 
শুয়ে “এক মন্ত্রে কর জপ, এক অস্ত্রে তপ' শুনতে শুনতে কখন যে 
ঘুমিয়ে পড়েছি, কতরাত অবধি গান চলেছে, কিছুই জানি না। 

গান শিখতে কিম্বা ভারতীয় সঙ্গীত সম্বন্ধে আলোচনা করতে কত 
বিচিত্র রকমের লোককে তার কাছে আসতে দেখা যেত। আমেরিকান 
যুবক, মেঘমন্ত্র গম্ভীর স্বরে গাইছেন-__-প্রো-ভা-টে বি-ম-লো 
আ-ন-ন্ডে”। (প্রভাতে বিমল আনন্দে )। কিন্বা মধ্যবয়েসী সিকিমি 
ভদ্রলোক, মিহি মোলায়েম গলা, সুরটাও ধরেছেন ঠিক, কিন্তু “তা-তা 
খৈ-খৈ' কিছুতেই মুখে আসছে না। “তা-তা তৈ-তৈ” দা-দা দৈদৈ' 
কতরকমই যে হচ্ছে । 

ছেলেদের রামায়ণ আর “ছেলেদের মহাভারত” বাবা আগে 
লিখেছিলেন । এবার একে একে “মহাভারতের গল্প” “ছোট্ট রামায়ণ' 
'টুনটুনির বই” “সেকালের কথা' ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর বই তিনি 
ছোটদের জন্য লিখলেন । এই সব বইএব চমৎকার ছবিগুলিও সব 
তার নিজের আকা । বাংলাদেশের শিশু-সাহিত্য ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, 
বাব! তাদের মধ্যে একজন অগ্রণী ছিলেন । 

ছোট ছেলেমেয়েদের বাবা বড় ভালবাসতেন । শিশুদের সঙ্গে 
শিশুর মতই আনন্দে তিনি হাসি-খেলা নাচ-গানে মেতে উঠতেন। 
ছোটদের ভাঙ্গবাসতেন, তাদের মন বুঝতেন বলেই বুঝি এমন সুন্দর 
সহজ মিষ্টি হত তার লেখা । 

বাবার মতন মিষ্টি কথাবার্তা খুব কম লোকের মুখেই শুনেছি। 


ছোটবড় সকলের সঙ্গেই সমান মিষ্টি ও ভদ্র ছিল তার ব্যবহার । 
কাউকে অভদ্রতা করতে দেখলে বেশ চমতকার করে তাকে ভদ্রতা 
শেখাতেন। 

একবার কি কাজে পোস্টাফিসে গিয়েছেন, পোস্টমাস্টারটির যেমন 
টিলেঢাল! কাজ, তেমনি তিরিক্ষি তার মেজাজ । সামান্য কাজে এত 
দেরি করছেন যে, লোক ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠছে । বাবা খুব 
ভদ্রভাবে তার কাজটির জন্য অনুরোধ করতেই ভদ্রলোক একেবারে 
খিঁচিয়ে উঠলেন--“দেখছেন তো মশাই কাজ করছি, আমার কি 
চারটে হাত 1” শান্ত স্বরে বাবা বললেন, “কি জানি মশাই, বয়েস 
তো৷ হয়েছেঃ অনেক দেশে ঘ্ুরেছিও, কিন্তু চারটে হাতওয়ালা 
পোস্টমাস্টার তো কখনও কোথাও দেখিনি । তবে ছুটো হাত দিয়েই 
তারা অনেক তাড়াতাড়ি কাক্ত করেন ।” আশপাশের লোক সবাই 
হেসে উঠল আর পোস্টমাস্টাবও লঙ্ঞিত হয়ে তাড়াতাড়ি কাজটি সেরে 
দিলেন । 

আরেকটি ঘটনা বলি। নিমন্ত্রণ-বাড়িতে বামুনঠাকুররা পরিবেশন 
করছে, বাড়ির কর্তা দ্রাড়িয়ে তদারক করছেন । গণ্যমান্য লোকদের 
খুব আদর আপ্যায়ন হচ্ছে, কিন্তু নিমন্ত্রিত গরীব ভদ্রলোকদের কেউ 
যত্ব আদর করছে না। “গরম লুচি! গরম লুচি!” হাঁক শুনে 
একজন বললেন, “ঠাকুর, আমাকে ছুখানা গরম লুচি দাও তো ?” 
কর্তা অমনি ব'লে উঠলেন, “তা! ব'লে পাতের ঠাণ্ডা লুচিগুলো ফেলে 
দেবেন না যেন!” তারপরেই বাবার কাছে এসে খাতির করে বললেন, 
“আপনাকে ছুখানা গরম লুচি দিক ?” বাবা অত্যন্ত বিনীতভাবে উত্তর 
দিলেন_-“কিস্ত আমার পাতের ঠাণ্ড। লুচি তো! ফুরোয়নি ?” তখন 
গৃহকর্তা লজ্জা পেয়ে সেই ভদ্রলোককে এবং সবাইকেই সমান যত্ব করে 
খাওয়ালেন । 


৮৪ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





চতুর্দশু, পরিচ্ছেদ 

ছোট্টবেলায় কবে দাজিলিং গিয়েছিলাম আমার কিছুই মনে ছিল 
না। দাদা-দিদিরা গল্প করত, আর আমি শুনতাম । এবার গরমের 
ছুটিতে দাজিলিং যাওয়া হবে শুনে আমার খুব আনন্দ হল। এবার 
নমাসীও আমাদের সঙ্গে গিয়েছিল । শিয়ালদহ স্টেশন থেকে যখন ট্রেন 
ছাড়ল, __মাসী গাড়ির দরজায় দাড়িয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগল ; 
বাবা কতবার বসতে বললেন, সে গ্রান্থই করল না। খুব জোরে 
বাতাস বইছে,-_মাসীর বব-করা চুল হাওয়ায় উড়ছে, হঠাৎ র্যাকের 
উপর থেকে বাবার টুপিটা দমকা হাওয়ায় উড়ে জানালা দিয়ে বাইরে 
চলে গেল! যাবার সময় মাসীর মাথায় জোরসে এক থাগঞ্নড় কসিয়ে 
দিয়ে গেল! «কে রে?” বলে মাসী চমকে ঠেঁচিয়ে উঠল, আমরা তো 
হেসেই কুটিপাটি। «বেশ হয়েছে । যেমন বাবার কথা শুনছিলে না 
তেমনি শাস্তি হয়েছে ।” 

পঞ্চাশ বছরেরও আগেকার কথা । সারা-ব্রীজ তখন হয়নি, 
সারাঘাট থেকে দামুকদিয়াঘাট খেয়া-জাহাজে পার হয়ে ওপারের ট্রেন 
ধরতে হত। শিলিগুড়িতে আমাদের চেনা এক পরিবার ছিলেন, তারা 
স্টেশনে দেখ! করতে এলেন । সঙ্গে পোলাও কালিয়া কাটলেট অনেক 
কিছু এনেছিলেন, বেশ ভোজ হল । তারপর পাহাড়ের লাইন্রে ছোট্ট 
গাড়িতে চড়ে বসা গেল। ট্রেনে যেতে অনেক সময় লাগে বলে 
আজকাল অনেকে মোটরে শিলিগুড়ি থেকে চলে যান। ইদানীং প্লেনে 


৮৫ 


যাবার ব্যবস্থাও হয়েছে। তখন তো গ্লেন বা মোটর ছিল না, ট্রেনও 
খুব আস্তে আন্তে চলত । পরা রানার রা 
দৃশ্য তাল করে দেখবার অবসর পাওয়া যেত। | 

. ছোট লাইনের ছোট্র গাড়ি আস্তে আস্তে উপরে উঠছে। ছু পাশে 
ঘন বন, গাছপালা ভিড় করে গীয়ে গায়ে ঠেসাঠেসি করে আছে, 
আকাশে উকি দেবার চেষ্টায় ঠেলাঠেলি করে মাথা তুলছে। ফাক! 
জায়গায় যে-সব গাছ অনেক ডালপাল! ছড়িয়ে অনেকখানি জায়গা 
জুড়ে থাকে, এখানে হাত পা মেলবার জায়গা না পেয়ে রোদ বাতাস 





পাহাড়ের গা বে একে বেক গাড়ি চলেছে 


পাধার জন্য খালি লা হরে উপর দিকেই বেড়ে চলেছে। গাছের 
গায়ে গায়ে প্রকাণ্ড লতা জড়িয়ে পেঁচিয়ে আছে, ডালে ভালে সবুজ 
“মস' (02088) মালার মত বুলছে, কলাগাছের মত বড়- বড় ৭টি ফান”? 
গাছ সুন্দর পাতা মেলে দলে দলে দ্লাড়িয়ে আছে । রনের ভিতরটা 
আবছায়া অন্ধকার মত, কেমন একটা ভ্যাপসা, স্যাৎসেতে গন্ধ. 

- পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকে বেঁকে. লাইন চলেছে-_-“লুপ্'-এর মধ্যে 
পাক খেয়ে জিগজ্যাগ-এ এগিয়ে পিছিয়ে, কত কায়দ! করে অল্প জায়গার 


৮৬ 


মধ্যে অনেকখানি উ'চুতে উঠে যাচ্ছে । মাঝে মাঝে যখন পাহাড়ের 
ফাকে ফাকে নীচের সমতল ভূমি দেখা যাচ্ছে, ঠিক যেন সুন্দর 
একখানা রভীন রিলিফ ম্যাপ কেউ বিছিয়ে রেখেছে, তখন. বোঝা 
যাচ্ছে কতখানি উ'চুতে আমরা উঠছি । একেবারে মেঘের উপরে 
উঠে গিয়েছি; মাথার উপরে রোদ, পায়ের নীচে পাহাড়ের কোলে 
মেঘ, সেই মেঘের-উপরে সুর্যের আলে! পড়ে রামধন্থু পাহাড়ের গ৷ 
বেয়ে আকাশে উঠে গিয়েছে । কি চমৎকার যে লাগছে দেখতে ! 
তারপর যখন একটা মোড় ঘুরেই বরফ-ঢাকা “কাঞ্চন্জজ্ঘা' প্রথম 
চোখে পড়ে, কি আশ্চর্য সুন্দর লাগে দেখতে । 

কত সুন্দর সুন্দর ঝরন! পাহাড়ের গ! বেয়ে নেমেছে; সবচেয়ে 
বড় যে পাগলাঝোরা,সে প্রতি বৎসর বর্ষাকালে একেবারে পাগলা 
হয়ে গিয়ে রাস্তাঃ রেল লাইন সব ভেঙে দিত, তাই.তাকে বেঁধে জলের 
ধারাকে ছুই-তিন ভাগ করে ঘ্বুরিয়ে দেওয়া হয়েছে । এখন আর তার 
আগের মত তেজ নেই। স্টেশনে ট্রেন থামলেই পাহাড়ি মেয়েরা 
হাসিমুখে সুন্দর সুন্দর অকিভ, পাতার ঠোঙায় করে পাকা গুজবেরী 
ফল বিক্রী করতে আনছে । ছোট. ছোট ছেলেমেয়ের! “বকৃশিশ ! 
সাব, বকৃশিশ !” বলে চেঁচাতে টেঁচাতে গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে-_ 
খাদাবৌচা মুখ, কৃৎকুতে চোখ, গাল ছুটি. আপেলের. মত লাল । 

ঘুম স্টেশনে গাড়ি. থামতেই “ঘুম-বুড়ি' এসে ফোকলা মুখে একগাল 
হেসে দাড়াল । ছ্‌ হাত পেতে বেড়ালছান/র মত. সরু গলায় বলল, 
“বা-বু পোইসা ?” বুড়ির যে কত.বয়েস কেউ জানে না। কেউ বলে, 
আশি-নববই ; কেউ বলে, একশো-দেড়শো । একটিও দত নেই, 
মুখের চামড়া কুচকে আমসির মত হয়ে গিয়েছে। ছোট ছোট 
পিটপিটে চোখ ছুটি হাসলে পরে একেবারে বুজে মিলিয়ে যায়। 
সাহেবরা- ওর নাম কেন যে “ঘুমডাইনী'€ উইচ অভ, ঘুম ) রেখেছিল 


৬৮৭ 


জানি না। শিশুর মত সরল ওর মুখখানি দেখলেই ভাল লাগে, 
সকলেই খুশি হয়ে ওকে ভিক্ষা দেয়। ও আগে কোথায় থাকত, 
কি করত, কেউ জানে না। রেল লাইন তৈরী হয়ে অবধি ও এই 
স্টেশনে ভিক্ষা করছে, আর এই বিশ-পচিশ বছর ধরে ওর চেহারা 
নাকি ঠিক এ একরকমই রয়েছে । কয়েক বৎসর পরে ঘুম-বুড়ি যখন 
মারা গেল তখন ওর সারাজীবন ভিক্ষা করে সঞ্চিত দশ-বারো হাজার 
টাকা গরিবদের বাসোপযোগী একটা ধর্মশালা তৈরী করবার জন্যে দান 
করে গিয়েছিল । 

ঘুমের পরেই দাজিলিং। স্টেশনে পৌছবার আগেই রাস্তার ধারে 
একটা বাড়ির গেটে দেখি স্ববালামাসী হাসিমুখে ফ্াড়িয়ে আছেন, 
বুঝলাম এটাই আমাদের বাড়ি। ওদের বাড়ির পাশেই, ওরাই 
আমাদের জন্য বাড়ি ঠিক করে রেখেছিলেন । স্টেশনে কুলীরা দেখি 
সবাই মেয়ে। একটি অল্পবয়েসী মেয়ে একটা মস্ত ্রাঙ্ক ধরে টানাটানি 
করছে দেখে স্থরমামাসী বলল, “এত বড় ট্রাঙ্ক কি ভুমি একলা নিতে 
পারবে 1” মেয়েটি এক হ্যাচক! টানে বাঝ্সটা পিঠে তুলে হেসে বলল, 
“এর উপরে আরেকটা চাপিয়ে দাও ।” কি শক্ত এই পাহাড়ি মেয়েরা ! 
বড় বড় বাক্স-বিছানা পিঠে তুলে কপালের সঙ্গে একটা চামড়ার স্ট্র্যাপ 
দিয়ে আটকে নিয়ে কেমন অনায়াসে পাহাড়ে ওঠানামা করে । 

ওদেশে দোকান-বাজারেও দেখলাম বেশীর ভাগই মেয়ের! বিক্রী 
করছে। তাদের মধ্যে অনেকেরই গায়ে মোটা মোটা সোনা-রাপোর 
গহনা-পরা । অনেকে বিশেষত নেপালী মেয়েরা বেশ স্ন্দর দেখতে । 
গরিব লোকেরা অত্যন্ত নোংরা । শীতের দেশ, স্নান করতেই চায় 
না। তাছাড়। গরম জামা-কাপড় তো বেশী জোটে নাঃ একসেট যা 
থাকে, তা-ও ক্রমে ময়লা তেলচিটচিটে ও ভূর্গন্ধ হয়ে যায়! তবে 
স্বদ্দরই হোক আর খাদার্বোচাই হোক, পরিষ্কার হোক কি নোংরাই 


৮৮ 


হোক, সকলেরই বেশ স্বাস্থ্যপূর্ণ চেহারা আর মুখে হাসিটি লেগেই 
আছে। 

পাহাড়ের গায়ে সুন্দর ছবির মত শহরটি । চারদিকের দৃশ্য কি 
চমতকার । সবচেয়ে দেখবার জিনিম বরফের পাহাড় । ক্ষণে ক্ষণে 
তার রূপ বদলায়, _-ধবধবে সাদার উপর গোলাপী সোনালী রূপালী, 
কত রংই না খেলে যায়। আর সুন্দর লাগে, মেঘ ও কুয়াশার খেলা 
দেখতে । সকালে উঠে দেখি, রাশি রাশি পেঁজা তুলোর মত মেঘ 
পাহাড়ের কোলে যেন ঘুমিয়ে আছে, রোদ উঠলে পরে তারা আস্তে 
আস্তে পাহাড়ের গা! বেয়ে নিচে থেকে উপরে উঠতে লাগল, ঘন 
কুয়াশার মত চারদিক ছেয়ে ফেলল । গাছপালা, ঘর বাড়ি, সব ঢাকা 
পড়ে গিয়েছে, কয়েক হাত দূরে আর কিছুই দেখা যায় না । আবার 
আস্তে আস্তে মিস্ট' কেটে গিয়ে চারদিক পরিক্ষার দেখা গেল; নাকে, 
মুখে, চুলে, কাপড়ে বিন্দু বিন্দু জলের কণা লাগিয়ে দিয়ে গেল । 

গাছপাল! সব কেমন নতুন ধরনের । বীচ, বার্চ, রডডেনড্রন, 
পাইন, ফার প্রস্ততি কত গাছ। যে সব বিলিতি ফুলের এতদিন শুধু 
নামই শুনেছিলাম আর বইয়ের পাতায় ছবি দেখেছিলাম, এখানে 
তাদের গাছে ফুটে থাকতে দেখে কত আনন্দ হল। কি ্ুন্দর ফুল! 
বাগান যেন আলো করে আছে। বড় বড় ঝাউগাছের গা! বেয়ে 
গোলাপের লতা চুড়ো পর্যস্ত উঠে গিয়েছে আর ফুলে একেবারে ভরে 
রয়েছে-_ঠিক যেন গাছটিকে কেউ ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে । 

রোজ দল বেঁধে বেড়াতে বেরোতাম । বাবা যখন ছবি আকতেন, 
তখন মেসোমশাইর (ডাক্তার প্রাণকৃষ্ণ আচার্য ) সঙ্গে বেরোতাম। 
.ম্যাল্‌, বার্চহিল, অবজার্ভেটরি হিল, বট্যানিক্যাল গার্ডেনস ইত্যাদি 
প্রায়ই বেড়াতাম। ম্যাল্‌-এর দিকে তখন এত ঘোড়সওয়ারের ভিড় 
ছিল না। একজন বেঁটে মোটা সাহেব একটা বেঁটে খাটো হাঁড়িমুখো 


৮৯ 


বুলডগ নিয়ে রোজ ম্যালে বেড়াতে আপতেন, আর একজন অল্পবয়েসী 
বাঙালী সাহেব আনতেন একটা প্রকাণ্ড বোর্‌ হাউণ্ড। কুকুর ত নয়, 
যেন একটা বাঘ ! ছুটো৷ কুকুর পরস্পরকে দেখলেই ফ্াত খি'চিয়ে 
গরগর করত । ছুই মনিবও একটু নাক তুলে পরস্পরের দিকে আড়- 
চোখে চেয়ে চলে যেতেন। হঠাৎ একদিন ম্যাল্‌-এর মাঝখানে ছুই 
কুকুরে ভীষণ লড়াই বেঁধে গেল। একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড! 
চারদিকে ভিড় জমে গেল। (কেউ বলে, “এমনি করে ধরো" ; 
কেউ বাতলায়, “ওদিক দিয়ে টান মারো? । সিসিক 





- *. শনএকটা বেটেখাটো হাড়িমুখো বুলডগ...একটা! প্রকাণ্ড বোর হাউও... 
হঠাৎ একদিন ম্যাল্‌"এর মাঝখানে ছুই কুকুয়ে ভীষণ লড়াই... 
কামড় ছাড়ান যায় না। .এদিকে ভিড়ের মধ্যে তর্ক বেধেছে, কার 
দোষ? কে আগে লেগেছে ?_বাজিধরাও চলেছে, কোন্‌ কুকুর 
জিতবে? অনেক কাণ্ড করে তো৷ ছুই কুকুরকে ছাড়ান গেল, ছুই 
মনিব পরস্পরকে শামিয়ে যে যার কুকুর নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন । 
পরদিন দেখা গেলে, বুলডগ জ্বর উপরে একটা -তাগ্সি লাগিয়ে বোঁচা 
লেজ নেড়ে, দিব্যি ঘুরে: বেড়াচ্ছে, কিন্তু বাঘা কুছুরের আর দশ-বারো 
দিন ধরে পাত্তাই পাওয়। গেল না 1. ও হী পা 


. আমাদের সবচেয়ে ভাল লাগত নির্জন রাস্তায় লম্বা পাড়ি দেওয়া । 
রাস্তা ঢালু দেখলেই মেসোমশাই হাকৃতেন, “দড়-কে' আর আমর 
'ছেলেবুড়ো সবাই মিলে হুড়যুড়িয়ে রেস্‌ দিতাম। জালাপাহাড়ের 
উপর দিয়ে হেঁটে ঘুম পর্যস্ত গিয়ে ট্রেনে ফিরে আসা আর বুম্ফিল্ড-এর 
মাঠে গিয়ে ছুটোচুটি করা আমানের খুব পছন্দ ছিল। বুমৃফিন্ড-এর 
মাঠটা মস্ত বড়। সেখানে মেসোমশাই ঘালের উপর পা৷ ছড়িয়ে বসে 
বিশ্রাম করতেন, তাঁকে 'বুড়ি' বানিয়ে আমরা চোর-চোর খেলতাম । 
“বুড়ি” ছোঁয়ার ধাক্কায় একেকদিন 'বুড়ি' চিৎপটাং হয়ে যেতেন । 

আমরা হুড়োহুড়ি, খেলতাম, দিদি আর স্ুরমামাসী ততক্ষণ 
ঝোপঝাড় থেকে বনফুল, ফার্ন ইত্যাদি সংগ্রহ করত। - পরে আরো 
কয়েকবার দাজিলিং গিয়েছি, তখন শহরের অনেক-উন্নতি হয়েছে, 
অনেক নতুন ঘরবাড়ি তৈরী হয়েছে, সে.সব বাগানে সুন্দর সুন্নর ফুল। 
কিন্ত আগে যেমন আনাচে কানাচে কত রকমের সুন্দর সুন্দর বনফুল 
_উড্‌ ভায়োলেট, ওয়াইল্ড প্যান্সি; কত অকিড.- গোল্ডেন ফা্ন, 
সিলভার ফার্ন, ইত্যাদি পেতাম সেরকম আর পাইনি । 

নীচের বস্তি থেকে গোয়ালার! বাঁশের চোডায় করে ছুধ বেচতে 
আন্ত। এত সুন্দর সে দুধ যে আসতে আদতে পথের বাঁকানিতেই 
মাখন তেনে উঠত । জাল দিলেই চমৎকার পুরু সর পড়ত। একটু 
ফেটালেই সেই.সর থেকে সুন্দর হলদে মাখন বেরোত । ঘরে তৈরী 
সেই টাটকা মাখন খেতে আমরা খুব ভালবাসতাম। শাকতরকারীই 
বা কতরকমের, আর কি সুন্দর ! ্ 

সেখানকার জলহাওয়ার গুণে আর অত বেড়াতাম বলে' খিদেও 
পেত খুন, কিন্তু খাউয়ার ময়েই বাধল বিপদ! বাবার শরীরটা 
খারাপ ছিল, মা এ সময়ে তার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে একটু ব্যস্ত 
থাকতেন, আমরা ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে খেতে বসতাম ।- মাসী ছিল, 


৯১ 


যাকে বলে “স্টাইলিশ ! সে এই সুযোগে আমাদের কায়দাছ্রস্ত 
করে তুলবার জন্য উঠে-পড়ে লাগল । “এমন করে বসবে না, অমন 
করে খাবে নাঃ হেন করবে না, তেন করবে না”-_-কড়া শাসন আরম্ভ 
হল। মহামুশকিল। বিশেষত, মাসী তো আমাদের চেয়ে সামান্াই 
বড়, তার সর্দারিটা বরদাস্ত হয় না। শেষটায় দাদা বিদ্রোহ করল। 
অত্যন্ত বোকার মত মুখ করে, হাঁ করে কুঁজো হয়ে এসে বসল, ছুই 
হাতে মুঠো করে কীটা-চামচ খাড়া করে ধরে, খটাখটু শব্দে খেতে 
আরম্ভ করল; তাড়া খেয়ে, অতি সন্তর্পণে কাটা-চামচ ঠিক করে 
ধরতে গিয়ে, “কি যেন কি করে' হাত-ফস্কে চামচ-কাটা এদিক ওদিক 
ছিটকে প্রড়ে গেল। সোজা হয়ে বসতে বলাতে, চেয়ারের ছুই 
হাতলে ভর করে আন্তে আস্তে কষ্টেম্্টে খাড়া হওয়ামাত্রই হঠাৎ “কেমন 
করে যেন' পিছলে শরীরট। সড়াৎ করে টেবিলের নীচে চলে গেল আর 
চিবুকটা ঠকাস্‌ করে টেবিলে ঠুকে গেল।-__মাসী যতই ধমক্চমক 
করে, দাদা ততই হাদার মত মুখ করে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়-_-কতই 
যেন ভয় পেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছে আর প্রাণপণ চেষ্টা করবার ভান করে 
অদ্ভুত আনাড়ি-পণা দেখায় । তিক্ত-বিরক্ত হয়ে মাসী আমাদের 
'স্টাইলিশ' করবার চেষ্টা ছেড়ে দিল, আমরাও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। 

ভূতের ভয়টা ওদেশে খুব আছে । রাত্রে কেউ সহজে ঘরের বার 
হতে চায় না। ওখানে যেমন হিন্দু দেবদেবীর মন্দির আছে, বৌদ্ধ 
গোম্পা-ও আছে । পথেঘাটে বৌদ্ধ লাম! দেখতে পাওয়া যায়, তাদের 
হাতে একটা বুমঝুমির মত দেখতে জিনিস ( প্রেয়ার হুইল ) তার মধ্যে 
”ওম্‌ মণিপদ্‌মে হুম্‌” ইত্যাদি মন্ত্র লেখা থাকে, যন্ত্র! ঘুরিয়ে মন্ত্র জপ, 
করা.হয়। আবার এখানে-সেখানে বাশের ঝাণ্ডার গায়ে রাশি রাশি 
কাগজ ও কাপড়ের টুকরো ঝোলান থাকে । এ সব টুকরোতে নাকি 
ভুতের উপদ্রব ও অমঙ্গল দূর করবার মন্ত্র লেখা থাকে । 


৯২. 


আমাদের বাড়িটা ছিল কার্ট রোডের উপরে । সামনেই রেলের 
লাইন, ছপুরবেলায় ট্রেন আসবার সময় গেটের পাশের বেঞ্চে গিয়ে 
আমরা বসতাম। প্রায় প্রতিদিনই দেখতে পেতাম চেনা কেউ-না-কেউ 
এল । : 

হঠাৎ একদিন কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম এল-__ধন-খুড়িমার খুব 
অস্থখ, অবস্থা খারাপ । রাতারাতি প্যাক কর! শেষ করে পরদিন 
সকালের গাড়িতেই আমরা চলে এলাম। কয়েকদিন পরে খুড়িমা 
মারা গেলেন, তিনটি ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে ধনকাকা আমাদের 
বাড়িতে চলে এলেন । এতদিন আমর! বাড়িতে সাতজন ছেলেমেয়ে 
ছিলাম, এবার দশজন হলাম ! 


৩ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ 

এই দশটি ছেলেমেয়েকে বুকে করে, স্নেহ মমতা, সেবা! দিয়ে ঘিরে 
মান্নুষ করেছিলেন আমার্দের মা । শুধু নিজের পরিবারেই নয়, 
আত্মীয়ত্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-পড়শী, যে কেউ তার সংস্পর্শে আসত, 
সকলকেই তিনি সহজে আপনার করে নিতেন। মাকে দেখতাম, 
সারাদিন কাজে ব্যন্ত-_যেন তার নিজের আরাম বা বিশ্রাম বলে কিছু 
নেই। বাড়ির সমস্ত কাজ দেখাশোনা করা, সকলের সেবাযতৃ করা, 
বাইরে সকলের খোঁজখবর নেওয়া, কার অন্থখ, কার কি অভাব, কার 
কিসে সাহায্য দরকার, সব দিকেই তার খেয়াল থাকত । কতবার 
দেখেছি, কারো হয়তো অন্ুখ, কিছু খেতে পারছে না শুনে মা 
নানারকম সহজ স্ত্বাহ্ব খাবার নিজের হাতে তৈরী করে পাক্কি করে 
নিয়ে গিয়ে সামনে বসে খাইয়ে আসতেন । 

একবার বিদেশে চেঞ্জে গিয়েছি। নতুন জায়গায় পৌছে সবাই 
ব্যস্ত। এত ব্যস্ততার মধ্যেও দূরে কোথায় ছোট ছেলের ক্ষীণ কান্না 
মা'র কান এড়ায়নি। খোঁজ নিয়ে জানলেন, মস্ত কম্পাউগ্ডের 
একাপ্রস্তে আউট-হাউসে মালীর ছোট্ট ছেলেটা! পেটের অস্ুখে ভুগছে । 
মালী-বৌ ছেলে সামলাতে পারে না, যত্ুটত্ব কিছুই জানে না। ভুগে 
ভুগে ছেলেটা হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছে। এত কাজের উপর মা'র 
আরেক কাজ বাড়ল, রোজ চারস্প।চবার করে ছুধ বালি নিয়ে গিয়ে 
বাচ্চাকে খাওয়ানো, তাকে ওষুধ দেওয়া আর তার মাকে ছেলের যত্ব 


৯৫ 


নিতে শেখানো । অল্প দিনের মধ্যেই সে ছেলের এতদিনের অসুখ 
ভাল হয়ে গেল । 

দেশ থেকে আমাদের রর রানার ভাই এল। অনেকদিন 
ধরে কঠিন অস্থখে ভুগছে, কিছুতেই সারে না, তাই তার বাবা ম৷ 
আমাদের বাবা মায়ের কাছে তাকে রেখে গেলেন চিকিৎসার জন্য । 
ভয়ানক রোগা, কিছুই হজম হয় না। ওদিকে আবার লুকিয়ে 
লুকিয়ে কেরোসিন, তেল, মাটি ইত্যাদি অদ্ভুত জিনিস খায়; 
কবিরাজ বললেন, এ অস্থুখ সারতে সময় নেবে, আর খুব সাবধানে 
এবং নিয়মে থাকতে হবে। কত রকমের ওষুধপথ্যঃ আর সে সব 
তৈরী করাও কি কম হাঙ্গামা ! মা নিজে সে সমস্ত করতেন, কত করে 
ভুলিয়ে ভালিয়ে তাকে “পোড়ের ভাত” আর কত কি সব “সণ্ড ইত্যাদি 
পথ্য খাওয়াতেন আর সব সময়ে চোখ রাখতেন, যাতে লুকিয়ে যাতা 
নাখায়। কয়েক মাসের মধ্যে সে ভাল হয়ে উঠল, আমাদের সঙ্গে 
চেঞ্জে গেল, তাবপর দেশে ফিরে যাবার সময় মাকে ছেড়ে যেতে তার 
কী কান ! 

আমাদের বাড়িতে যার কাজ করত, মা তাদের পরিবারের 
লোকের মতই স্রেহ যত্ব করতেন। তারাও তেমনি তার অনুগত 
ছিল। আমাদের “বামুনদিদি', “তৃতুর ঝি”, প্রয়াগ ( বেয়ারা ), 
কামিনী ( জমাদারনী )_ ছোটবেলা! থেকেই এদের আমরা দেখে 
এসেছি । জোয়ান বয়েসে এরা আমাদের বাড়িতে এসেছিল, আর 
যতদিন খাটবার শক্তি ছিল, ততদিন আমাদের ছেড়ে কোথাও যায়নি । 
সাধ্যমত আমাদের সেবা করেছে, ছেলের মত আহলাদ আবদার 
করেছে, বুড়ে৷ হয়ে দেশে চলে গেলেও ম! ওদের খবর রেখেছেন আর 
দরকারমত সাহায্য করেছেন। ওদের কারো কারো ছেলে, বৌ, 
নাতি পর্যস্ত আমাদের বাড়িতে কাজ করেছে । 


৯৬ 


মা একটা কথা বলতেন, “দিয়ো কিঞিৎ, না করে৷ বঞ্চিৎ 1” অর্থাৎ 
ভাল জিনিস সবাইকে কিছু কিছু দিয়ো, কাউকে বঞ্চিত করে! দা । 
ঠাকুরদাদা নাকি ঠাকুরমাকে এই কথাট! সর্বদা বলতেন। মা'রও 
কথাট! খুব মনে ধরেছিল । তাকে যেমন মুখে একথা বলতে শুনতাম, 
কাজেও তাই করতে দেখতাম । কোনও ভাল জিনিস সবাইকে দিতে 
না পারলে তার তৃপ্তি হত না। 

ম! খুব সুন্দর রাম করতে আর নানারকম খাবার তৈরী করতে 
পারতেন । নতুন কোনে ভাল রান্না দেখলেই শিখে নিতেন, নিজের 
মন থেকেও কত রকম স্মন্দর সুন্দর নতুন রান্না করতেন। কত রকম 
আচার, মেরববা, আমসত্ব ইত্যাদি সারা বছর তৈরী করতেন, আন 
কার কোন্‌ আচারটা খুব পছন্দ, কার অরুচির জগ্য জারকলেবুঃ কার 
অজীর্ণের জন্য বেলের মোরববা,ঃ এমনি করে কত লোককে দিতেন । 
নিজের হাতে রেধে সবাইকে খাওয়াতে তিনি খুব ভালবাসতেন-_ 
বাড়িতে সর্বদাই বেশ একটা লোকজন খাওয়ানোর ধুম লেগে থাকত। 
এখনও কত জনের মুখে মায়ের হাতের রান্না ও আদর-যত্বের কথা 
শুনতে পাই। ডক্টর জে. টি. স্যাপ্ডারল্যাণ্ড ( “ইপ্ডিয়া ইন্‌ বণ্ডেজ' নামে 
প্রসিদ্ধ বই ধার লেখা ) একবার আমাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণে এসে মা'র 
রান্না খেয়ে বারবার বলেছিলেন, “আপনি আমাদের দেশে (আমেরিকা) 
এসে একটা রান্নার স্কুল খুলুন--আমি নিশ্চয় বলতে পারি যে, সে 
স্কুলের অত্যন্ত আদর আর খ্যাতি হবে ।” 

আমর! যেমন একটু বড় হলাম, মা আমাদের সঙ্গে নিয়ে ঘরের 
সব কাজ শেখাতেন। যারা একটু বড়, তাদের একটু কঠিন কাজ 
আর যার! ছোট, তাদের সহজ কাজ ভাগ করে দিতেন । মা বলতেন, 
দশে মিলি করি কাজ-_হারি-জিতি নাহি লাজ ।” লবাই মিলে পাল্লা 
দিয়ে কাজ করতে বেশ খেলার মতই মজা লাগত | হয়তো খাবার 
বু 

004 


তৈরী করতে করতে কতগুলো পুডুলের খাবারের গত "ছোট্র ছোট 
খাবার হল, ছোট কড়ায় ছোট্ট ছোট্ট লুচি ভাজ! হুল, বড়ি দেবার সময় 
ছোট্ট একটা পাত্রে এতটুকু ক্ষুদে ক্ষুদে বড়ি দেওয়া হল। বড়ি 
কারো ধ্যাবড়া হচ্ছে, আর সবাই দেখে হাসছে । তখন ম! একটা 
মজার গল্প বললেন : মা'রা যখন ছোটবেলায় বড়ি দিতে শিখতেন, মা'র 
দিদিমা বলে দিতেন, “যে মেয়ে যেমন বড়ি দেবে, তার বরের তেমনি 
নাক হবে” পাছে বরের থ্যাবড়া নাক হয়, সেই ভয়ে সব মেয়েরা 
অতি যত্বে সুন্দর টিকলে!৷ বড়ি দিত। গান-বাজনা, ছবি-াকা 
ইত্যাদি আমি দাদা-দিদিদের মত ভাল পারতাম না, কিস্তু এই সব 
কাজ আমার খুব ভাল লাগত । খুব উৎসাহের সঙ্গে চটপট শিখতাম । 
আর দিদির ছিল আর্টিস্টের হাত; তার হাতের সব কাজ পরিপাটি 
হত, সব জিনিসের গড়ন হুন্দর হত। 

একদিন মা পিঠে তৈরী করছেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে শিখছি, এমন 
সময় একজন ভদ্রমহিলা দেখা করতে এলেন। এ'র স্বামী মারা 
গিয়েছেন, ছেলেপিলে নিয়ে কষ্টে পড়েছেন, মা'র কাছে মাঝে মাঝে 
সাহায্যের জন্য আসতেন । খানিকক্ষণ বসে কথাবার্তার পর তিনি বাড়ি 
যাার জন্য উঠছেন, মা তাকে একটু বসতে অন্নুরোধ করলেন। তিনি 
ইতস্তত করে বললেন, “চারটে বাজে, ছেলেদের স্কুল থেকে ফিরবার 
সময় হল--” বলতে বলতেই প্রয়াগের সঙ্গে তার ছেলেমেয়েরা এসে 
হাজির! এর মধ্যে কখন যে মা লোক পাঠিয়ে ওদের নিমন্ত্রণ করে 
এনেছেন, কেউ জানে না। আমরা দই বাড়ির ছেলেমেয়ে একসঙ্গে 
বসে আনন্দ করে খাচ্ছি, ছুই মা হাসিমুখে চেয়ে দেখছেন । হঠাৎ সেই 
মহিলার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ল। মাকে বললেন, 
“দির্দি, আপনি কি ঠিক আমার মনের কথাটি বুঝতে পেরেছিলেন ? 
পিঠে তৈরী দেখেই আমার মনটা কেমন করে উঠেছিল । কত কাল 


৯৮ 


ওদের হাতে এসব জিনিস দিতে পারিনি 1” 

মাঘোৎসবের শেষে প্রতি বৎসর শহরের বাইরে কোনও বাগানে 
“উদ্ভান-সম্মিলন' হয়। একবার সম্মিলনে ষিনি রাম্নার চার্জে ছিলেন, 
তিনি বললেন, “এবার মেয়েরা কেউ রান্নার এদিকে আসতে পারবেন 
না! মেয়েরা সারা বছর সংসারের কাজ করেন, বেরোতে পারেন না, 
আজ তার! শুধু বেড়াবেন- আমি ছেলেদের দিয়ে সব কাজ করাব |” 
প্রকাণ্ড বাগানে কয়েক শ' লোক জমা হয়েছে । সকালে গাছতলায় 
বসে উপাসনা, গান, কীর্তন ; তারপরে খেলাধুলা ও বেড়ানো, সারি সারি 
গাছতলায় বসে খিচুড়ি খাওয়া । পাল! করে খাওয়া শেষ হতে হতে 
অনেক বেল! হয়ে গেল। যের্ার ছেলেপুলে সামলিয়ে বাড়ি যাবার 
জন্ ব্যস্ত হলেন। মা আরো ছুয়েকটি ভদ্রমহিলার সঙ্গে রান্নাবাড়ির 
দিকে গেলেন ; ছেলের! এত পরিশ্রম করে সবাইকে খাওয়াল, এবার 
ওরা তাদের খাওয়া দেখবেন । গিয়ে দেখেন, হায় কপাল! খিচুড়ি 
সব শেষ। চাল-ডালও নেই যে আবার চড়ানো হবে, কাছে দোকান- 
পাঁটও নেই যে কিনে আনবে, রান্নার ঠিকে-বামুনেরাও শেষ হাঁড়িটি 
নামিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে । ছেলেরা 
বলল, “তরকারি আছে, দৈ-মিষ্তি আছে, ওতেই হয়ে যাবে” মা 
দেখলেন, কিছু ঘী আছে, ময়দাও কিছু রয়েছে, কিন্তু চাকি, বেলনা, 
কিছুই নেই। ছেলেদের বললেন, “তোমবা তো অনেকে সাইকেলে 
এসেছ, ছুয়েকটা পাম্প নিয়ে এসো তো ?” ছেলের! পাম্প এনে দিল, 
তাই দিয়ে পি'ড়ের উপর লুচি বেলে মা ওদের গরম লুচি খাবার 
ব্যবস্থা করে দিলেন। 

একবার দাজিলিংয়ে মা'র “হিল ডায়েরিয়া” হয়েছিল । বাবা-মা'র 
বন্ধু একজন ডাক্তারের চিকিৎসায় সেরে গেল। এক মাস ধরে 
ডাক্তারবাবু মাকে 'কীচকলা-ভাতে-ভাত' পথ্য করিয়েছিলেন। ভাল 


৯৪) 


হয়ে উঠে একদিন মা ডাক্তার-বন্ধুফে খাবার মিদন্ত্রণ করলেন। 
ভদ্রলোক এসে দেখেন, অনেক রকম রান্না হয়েছে, কিন্তু সুজ থেকে 
পায়েস পর্যন্ত, সবই কীচকলা ! দেখে যত না৷ অবাক হলেন, খেয়ে 
আরও অবাক হলেন-_ভারি খুশী হয়ে বললেন, “কীচকলা থেকে যে 
এত রকমের খান তৈরী হতে পারে, আমার ধারণাই ছিল না! 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





য্টদশ পরিচ্ছেদ 


সন্ধ্যাবেলা, মাস্টারমশাইর আসবার সময় হয়েছে, আমরা সবাই 
পড়ার টেবিল ঘিরে বসে অপেক্ষা করছি। ম্বরমামাপী আর দিদি 
একমনে বই পড়ছে । টুনী ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ ভার করে বসে আছে -- 
দাদা কি যেন বলে তাকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছে । মনির ছুষ্টমি-ভরা চোখ 
হুটো চকচক করছে, দেখেই বোঝা যায় টুনীর রাগটা সে বেশ উপভোগ 
করছে। দাদ! নিরীহ ভালমানুষটির মত বইয়ের উপর ঝুঁকে রয়েছে, 
টুনীর কি হয়েছে সে যেন কিছুই জানে না। হঠাৎ সি'ড়িতে জুতোর 
শব্দ শুনে দাদা বলল, “দেখ. তো! বুলু; মাস্টারমশাই আসছেন নাকি ?” 
তিন বছরের বুলু সিঁড়ির মাথা থেকে ঝুঁকে দেখে চেঁচিয়ে বলল, দনা, 
মান্তাল্মসাঁই না, মা-স্-তিমসাই।” সিড়ি দিয়ে যিনি উঠছিলেন 
তিনি হো-হো৷ করে হেসে উঠলেন, «শাস্তিমশাই ! সেকি রে? 
আমি কি তোদের শান্তি দিই?” 

শাস্তি দূরের কথা, এই মানুষটি বাড়িতে এলেই আমাদের মনটা 
খুনী হয়ে উঠত। 4শাস্ত্রীমশাই এসেছেন” শুনলেই আমরা যে যেখানে 
থাকতাম, কাছে গিঁয়ে জুটতাম । তিনি যে অমন সাধু, ভক্ত ও জ্ঞানী 
লোক, আমাদের ব্রাহ্মমমাজের নেতা পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী, 
ছোটবেলায় অতশত বুঝতাম না। চেহারাটাও তার স্বন্দর ছিল 
নাঃ কিন্তু সেই চেহারার মধ্যে, চোখ পিটপিট করে সেই হাসির 
মধ্যে, কী একটা আকর্ষণ ছিল, যার জন্য ছোট্টবেল! থেকেই আমর! 


59১ 


তর খুব ভক্ত ছিলাম । এমন কি দিদি, যে অমন শান্ত, সেও নাকি 
ছোট্টবেলায় শাস্ত্রীমশাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে তেড়ে ঝগড়া করত-_-“আমার 
শাস্ত্রী!” 

শান্ত্রীমশাই দাদামশাইয়ের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তার মেয়ে 
হেমমাসীম! মা'র প্রিয়সথী ছিলেন, বাবা-মাকেও শাস্ত্রীমশাই খুব 
ভালবাসতেন । প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন । 

আমাদের স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শাস্ত্রীমশাই । স্কুলের 
প্রতিষ্ঠার দিনটি ছিল তার জন্মদিন । সেদিন সকলে মিলে যেখানে 
বেড়াতে যাওয়া হত, শাস্ত্রীমশাইও আমাদের সঙ্গে যেতেন, আমাদের 
নিয়ে উপাসনা করতেন, আমাদের আমোদ-আহলাদে যোগ দিতেন, কত 
গল্প বলতেন । হাসি তামাশা তিনি খুব ভালবাসতেন । স্কুলের জন্ম- 
দিনের পিকনিকে একবার মস্ত বড় ড্রাম্-ততি রসগোল্লার দিকে তাকিয়ে 
শান্ত্রীমশাই বললেন, «এই সব রসগোল্লা কে একলা খেতে পারে ?” 
দাদা অমনি চেঁচিয়ে বলল, “আমি পারি।” তারপর আস্তে বলল, 
“অনেক দিন ধরে ।৮ শাস্ত্রীমশাই খালি হো-হো করে হাসেন আর 
বলেন, “আরে ! , এ যে “ইতি গজ' হল!” তারপর আমাদের মহা- 
ভারতের সেই “অশ্বখামা হত-_ইতি গজ' গল্পটা! বল্লেন । 

একবার ছাত্রসমাজের পার্টিতে শাস্ত্রীমশাই যেই বললেন, “উঃ, কি 
গরম!” অমনি এক ভদ্রলোক মস্ত একটা সিগার তার দিকে এগিয়ে 
ধরলেন। শাস্ত্রীমশাই অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকালেন, 
আমরাও অবাক হয়ে গেলাম : শাস্ত্রীমশাই যে তামাক চুরুট ইত্যাদি 
কিছুই খান না সে তো! সবাই জানে । (তখনকার দিনে অনেকেই 
খেতেন না, আমাদের বাড়িতেও বড়দের কাউকে কখনও খেতে 
দেখিনি । ) মুকুল" পত্রিকায় তার লেখা ভারি মজার কবিতা আর তার 
সঙ্গে তেমনি মজার ছবি বেরিয়েছিল : একটা ছেলে খুব সিগারেট 


১৪২, 


খেত, খেতে খেতে তার হাত, পা, সমস্ত শরীরটাই সিগারেটের তৈরী 
হয়ে গেল--সে-সব কথা আমাদের বেশ মনে আছে । এ ভদ্রলোক 
কি কিছুই জানেন না? ভদ্রলোক সিগারের মাথাটা একটু টিপে 
দিলেন, অমনি সেটা ফট. করে ফাঁক হয়ে গেল, আর শ্ুন্দর 
রঙ্গীন একটা জাপানী পাখা! বেরোঞ।। তখন শাস্ত্রীমশাইয়ের সে কি 
হাসি! নতুন খেলনা হাজতে পেয়ে ছোট ছেলেরা যেমন খুশী হয়ঃ 
তেমনি খুশী হয়ে তিনি পাখাট! নিয়ে একবার খুলছেন, একবার বহ্ধা 
করছেন । 

ছেলেপিলেদের তিনি খুব ভালবাসতেন । পরিচিত বন্ধুবান্ধব ও 
অ য়দের বাড়ির ছেলেমেয়েরা কেমন মানুষ হচ্ছে, কে কেমন 
লেখাপড়া করছে, সমস্ত খবর রাখতেন। এ বিষয়ে তার কি রকম 
আগ্রহ ছিল তার একটা গল্প মনে পড়ছে । কয়েক বৎসর পরের কথাঃ 
সেবার আমি আই. এ. পরীক্ষা বেশ ভালভাবে পাশ করেছি । পরীক্ষার 
ফল বেরোবার কয়েক দিন পরেই শাস্ত্রীমশাইয়ের সাংঘাতিক অসুখের 
খবর শুনে আমরা মা"র সঙ্গে তাকে দেখতে তাদের পদ্মপুকুরের বাড়িতে 
গেলাম । ভাল করে জ্ঞান নেই, আচ্ছন্নের মত বিছানায় পড়ে আছেন, 
মাঝে মাঝে একটু জ্ঞান হচ্ছে । হঠাৎ চোখ মেলে বললেন, “কে ?” 
মা তাকে দেখতে এসেছেন শুনে কাছে যেতে ইশারা! করলেন, আমরা 
একে একে প্রণাম করে কাছে গিয়ে দাড়ালাম । অত্যন্ত ছূর্বল, কথা 
বলতে পারেন না, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা । মামার দিকে চেয়েই হঠাৎ 
চোখ ছুটি যেন একটু উজ্জল হল। ফিসফিস করে বললেন, “ভা-ল 
পা-শ ক-রে-ছ, বড় খুশী হয়েছি--বেশ ! বেশ!” বলেই আবার চোখ 
বুদলেন। আমরা তো অবাক! এত অন্ুখের মধ্যেও এই সামান্ত 
কথাটি মনে রেখেছেন ! 

দাদামশাই নবহ্বীপচন্দ্র দাষ ছিলেন মা'র “মামাবাবু' ৷ শ্যামবর্ণ, 


১৪০৩ 


গোলগাল, মাথাভরা কাচাপাকা চুল, একটিও ্লাত নেই, 'আর সেই 
ফোক্লামুখের হাসিটি ছিল চমৎকার । আমরা তাঁকে যেমন ভাল- 
বাসতাম, তার সঙ্গে আহলাদ আবার করতাম, মনের কথা বলতাম, 
তেমনি হুষ্টমী করতেও ছাড়ভাম না। দাদামশাই মোটা ছিলেন বলে 
ভার একজন বন্ধু নাম দিয়েছিলেন, “ঢাকাই জালা” । আমরাও অনেক 
সময় আড়ালে তাকে 'জালাবাকু বলতাম & দাদামশাই খেতে আসছেন, 
চাকর তার জন্য পিঁড়ি পেতে দিল, দাদা চুপি চুপি কোথেকে একটা 
বিড়ে এনে পিঁড়ির পাশে পেতে দিল-_বি'ড়ে না হলে “জালা' বসবে 
কিকরে? 

একদিন দাদামশাই বললেন, “ন্্যারে, অমুক বাড়ির ছেলের! কেমন 
গড়গড় করে ইংরেজী বলে, তোরা তো অমন পারিস না 1” আমর! 
বললাম, “ওর যে বাড়িতে নিজেদের মধ্যেও ইংরেজীতে কথা বলে, 
ভাই অমন বলার অভ্যাপ হয়েছে । আসলে যে ওরা আমাদের চেয়ে 
কিছু ভাল ইংরেজী জানে তা" নয়।” দাদামশাইয়ের ভারি সাধ যে 
আমরাও এ রকম গড়গড় কয়ে ইংরেজী বলি। নিয়ম করে দিলেন যে, 
আমাদেরও বাড়িতে ,নিজেদের মধ্যে ইংরেজী বলতে হবে। ব্যবস্থাটা 
আমাদের মনের মত হল না, তাই ছষঈ, বুদ্ধি এটে আমরা নিজেদের 
মধ্যে তো বটেই, দাদামশাইয়ের সঙ্গেও ইংরেজী বলতে আরম্ভ করে 
দিলাম। তিনি বাংলা! বললে কিছু বুঝতে পারি না, ইশারায় বোঝাতে 
গেলেও হা করে থাকি । বেচারা ইংরেজী জানেন না তো, কাজেই ছু 
দিনেই আমাদের কাছে হার মানতে হ'ল । 

দাদামশাইয়ের কি যেন অস্থখ ছিল, একটা ব্যথায় বড় কষ্ট 
পেতেন। ওষুধপত্রেও বিশেষ ফল হত না। ডাক্তার বলেছিলেন 
ব্যথা হবার মত মনে হলেই কিছু খেতে, তাই তার কাছে কিছু ফল, 
বিস্কুট ইত্যাদি সর্বদা রেখে দেওয়া হ'ত। যে-কেউ তাকে দেখতে 


১9৪8 


আসত, এঁক কোয়া কমলালেবু, একটি আঙ্গুর, কি এক টুকরো 
বিস্কুট আদর করে তার মুখে তুলে দিতেন । আমরা কাছে বসে 
হাত বুলিয়ে দিতাম, বাতাস করতাম, কষ্ট বেশী হলেও কখনো 
অস্থির হতেন না। চোখ বুজে, আন্তে আস্তে ভগবানের নাম 
করতেন। 

নিজে তিনি বিয়ে করেননি, কিন্ত লোকের বিয়ে দেবার জন্য তার 
ভারি আগ্রহ ছিল। বন্ধুরা তাই ঠাট্রা করে তাঁকে ঘটকঠাকুর বলতেন । 
টাকাপয়সা তার ছিল না, যেটুকু সামান্য সঞ্চয় ছিল, সব দান করে 
ফেলেছিলেন । নিজের ঘরসংসার তার ছিল না, কিন্ত সকলের তিনি 
ছিলেন আপন জন, কারো “মামাবাবু” কারো “কাকাবাবু, ছোটদের 
“দাদামশাই' বুড়োদের “দাদা । যার যত সংসারের ছুঃখ ভাবনা 
অশান্তির বোঝা নিয়ে আসতো তাঁর কাছে, তিনি সান্বনা দিতেন, 
পরামর্শ দিতেন, ঝগড়া অশান্তি মিটিয়ে দিতেন,”-_যেন সবাইকে নিয়ে 
তার প্রকাণ্ড একটি সংসার । 

কবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাবার বিশেষ সৌহার্দ্য ছিল। বাবার 
বেহালাবাজনার প্রতি তিনি অনুরাগী ছিলেন। প্রতি বৎসর জোড়া- 
সাকোর ঠাকুরবাড়িতে উৎসবের সময় বাবাকে রবীন্দ্রনাথের নতুন 
নতুন গানের সঙ্গে বেহাল! বাজাতে হত । ছোটদের জন্য বাবা যে বই 
লিখতেন, তাতেও রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল। বাবার নতুন বই 
বেরোলেই আনন্দ প্রকাশ করে, আরো লিখবার উৎসাহ দিয়ে তিনি 
চিঠি লিখতেন। রামায়ণ মহাভারত প্রভৃতি দেশী গল্প শেষ হলে, 
«বিদেশী গল্পের ভাগ্ডারেও হাত দিতে” তিনি বাবাকে অন্থুরোধ 
করেছিলেন, কতগুলি বিদেশী বইয়ের নামও বলেছিলেন । রবীন্দ্রনাথকে 
মাঝে মাঝে বাবার কাছে আসতে দেখতাম-_এখন তার সাদা চুলদাড়ি 
ধাষির মত চেহারার ছবিই তোমরা বেশী দেখতে পাও, তখন আমরা 


১৬৫ 


দেখতাম তার কালো! কৌকড়ানো চুল, জোয়ান বয়েসের চেহারা । সে 
চেহারাও অবশ্য খুবই স্বন্দর ছিল। 

একদিন রবীন্দ্রনাথ বাবার সঙ্গে দেখা সেরে আচার্য জগদীশচন্দ্রের 
বাড়ি যাবার জন্য রওনা হলেন । বাড়িটা কাছেই ছিল, তাই হেঁটেই 
যাচ্ছিলেন, একটু পরেই আবার ফিরে এলেন। পথে যেতে যেতে 
দেখেছেন, একটা মরা ইছুর ফুটপাথে পড়ে আছে, দেখে মনে হয় 
প্লেগেই মরেছে । পাশেই ছেলেপিলেরা খেল! করছে, কত লোক 
আসছে-যাচ্ছে, ইণছুর থেকে যে প্লেগের ছোয়াচ লাগতে পারে সে 
খেয়াল কারো নেই । তাড়াতাড়ি ফিরে এসে তিনি বাবাকে বললেন । 
বাবা লোক নিয়ে গিয়ে ই'ছুরটাকে কেরোসিন ঢেলে জ্বালাবার ব্যবস্থা 
করলেন, তবে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে পারলেন । কাকার! খুশী হয়ে 
বললেন, “দেখ ! কবি শুধু ভাবেই ভুলে থাকেন নাঃ সব দিকেই তার 
দৃষ্টি আছে 1” 

আচার্য জগদীশচন্দ্র, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, এদেরও কত সময়ে 
আসতে দেখতাম । আচার্য জগদীশচন্দ্রকে কেমন যেন “ভোলা মানুষ 
মনে হত। একবার তিনি আমাদের বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে 
ফিরবার জন্য উঠেছেন । সিঁড়ির মুখে এসে হঠাৎ কি কথা মনে পড়ে 
গেল, দাড়িয়ে আবার বাবার সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন । এদিকে 
আমাদের স্কুলের সময় হয়েছে, আমরা বইখাতা হাতে নিয়ে ঘোরাঘুরি 
করছি; বাবা আমাদের দিকে পিছন ফিরে আছেন বলে দেখতে পাচ্ছেন 
না, জগদীশচন্দ্র আমাদের দিকেই ফিরে আছেন, কিন্ত দেখেও দেখতে 
পাচ্ছেন না । একমনে গল্প করে চলেছেন-_-আর এমনভাবে এদিকের 
রেলিংয়ে হেলান দিয়ে, ওদিকের দেওয়ালে হাত রেখে, বাঁকা হয়ে 
াড়িয়েছেন যে, আমাদের যাবার পথও নেই। রাস্তায় বাসের গুম্গুম্‌ 
শব্দ শুনে দিদি বলল, “চল্‌, পিছনের সিঁড়ি দিয়ে যাই ।” (রান্নাঘরের 


২০৬ 


দিকে একটা ঘোরানে৷ সি'ড়ি ছিল।) টুনী আপত্তি করল, “কেন? 
ঘুরে যাবো কেন?” “দেখছিসূ নাঃ উনি ওখানে দাড়িয়ে আছেন? 
“তাতে কি হয়েছে?” বলে টুনী বো-ও করে জগদীশচন্দ্রের হাতের 
তল! দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল, তিনিও চমকে উঠে হেসে পথ ছেড়ে 
দিলেন। 

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রকে দেখলে বোঝাই যেত না৷ যে অত বড় একজন 
পণ্ডিত মানুষ । ছোটখাটো! রোগা মানুষটি, মাথার চুল এলোমেলো, 
ঘরে-কাচা শার্টটা কুচকে রয়েছে, তাও আবার হাতে বোতাম নেই ! 
দাদা আর দিদি পাশাপাশি দাড়িয়ে ছিল, দিদি বয়েসে বড়, দাদা বেশী 
লম্বা, ঢুকেই জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি “দিদি” না, ও “দাদা” ?” 

বড় হয়ে এদের আরো কাছে দেখবার ন্থুযোগ ও সৌভাগ্য 
আমাদের হয়েছিল। বিশেষত দাদার নানাদিকে প্রতিভার উন্মেষ 
সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, রবীন্দ্রনাথের তো বিশেষ স্বেহের 
পাত্র হয়েছিল দাদা । তখন কিন্ত আমরা দূর থেকেই সম্ভ্রম ও 
কৌতূহলের সঙ্গে এদের দেখতাম : রবিবাবু! জে সি বোস! 
পিসিরায়! 


ছেলেবেলার দিনগুলি 


৮০. 





সপ্তদশ পরিচ্ছেদ 

সেবার পুরীতে গিয়ে আমর! প্রথম সমুদ্র দেখলাম । সকালে পুরী 
স্টেশনে পৌছবার অনেক আগেই দূর থেকে যেই নীল আকাশের 
গায়ে জগন্নাথ-মন্দিয়ের উচু চূড়া দেখা গেল, ট্রেনের যাত্রীদল ছুই হাত 
তুলে জয়ধ্বনি করে উঠল, “জয় জগন্নাথ” প্জয় জগন্নাথ ।” ঝাউ- 
গাছের ফাকে ফাকে দূরে সমুদ্র দেখা গেল! “সুন্দর মহারাজ”কেও 
তারা প্রণাম জানাল । স্টেশনে ট্রেন থামতে-না-থামতে চারদিক থেকে 
পাণ্ডার দল এসে একেবারে ছেঁকে ধরল । কোনো যাত্রীর ঠাকুরদাদ। 
কিংবা তার ঠাকুরদাদাও যদি কোনোদিন পুরীতে তীর্থ করতে গিয়ে 
থাকেন, তাহলে যে পাণ্ড তাদের তীর্থ করিয়েছিল তার কাছে তাদের 
নামধাম সব লেখা থাকবে এবং ভার্দের বংশের কেউ পুরী গেলে সেই 
পাণ্ডা কিংবা তার উত্তরাধিকারী এসে তাকে তীর্থ করাবার ভার দাবী 
করবে । যাত্রী নিয়ে মাঝে মাঝে পাগাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি, মারামারি 
লেগে যায়। আমরা তীর্থ করতে আসিনি, বেড়াতে এসেছি, অনেক 
করে একথা বুঝিয়ে বলে তবে তাদের হাত এড়ানো গেল। 

বাবার অশ্থ ছিল বলে সেবার মন্দিরের ভিতরে যাবার স্ববিধা 
হয়নি । গাড়ি করে মন্দিরের চারিদিকে, নরেন্দ্র-সরোবরে, আর 
শহরটায় ঘুরে দেখেছিলাম । তবে সমুদ্র দেখে মনে হল, আর কিছু 
না দেখলেও কোনো! ছুঃখ নেই। ছবি দেখে আর বর্ণনা শুনে মনে মনে 
সমুদ্রের একটা শারণা করে রেখেছিলাম, কিন্তু এত বিশাল আর এমন 


3৪৯ 


আশ্চর্য সুম্পর, কল্পনাও করতে পারিনি। সকালবেলার খুর্ঘোদয় ঠিক 
ধেন মনে হয়, সোনালী জলের মধ্যে থেকে একটা সোনার গোলা উঠে 
এল। দিনের বেলায় সমুদ্রের রঙ কোথাও নীল, কোথাও সবুজ, 
আবার মেঘল! দিনে সীসের মত রউ। ঢেউয়ের মাথায় মাথায় সাদ 
ফেনার মুকুট, স্ধাস্তের আকাশের লাল আতায় সমুদ্রের জল লালে- 
লাল। রা রানা সরাদিরা “তরলিত 





কুড়ানো, কীকড়া তাড়ানো, কতরকম মজা । চঞ্চল সমুদ্রের তীরে 
বড়রাও যেন আনন্দে ছোটদের মতই চঞ্চল হয়ে ওঠেন। শামুক-বিন্ুক 
কত. রকমের, আর: কি সুন্দর !: প্রথম দিন তো জান! ছিল না, ঢেউ 
এসে আছড়ে পড়ল; সাদা সাদা ফেনা উ্‌লে উঠল, জল যখন সরে 
ছে দে সে টা শর শা গাছে দখা মু 


১৯৩ 


সেটাকে যেই তুলতে গিয়েছি, অমনি আরেকটা প্রকাণ্ড ঢেউ এসে 
আমাকে একেবারে চিৎ করে ফেলে দিল। পায়ের জুতো! থেকে 
মাথার ফিতে পর্ন্ত ভিজে গেল, নোনা জলে দুখ ভরে গেল, তাড়াতাড়ি 
বাড়ি ফিরতে হ'ল। | 

মাছই বা কতরকম। ভোরবেলায়সুলিয়ারা নৌকা চড়ে বেরিয়ে যায, 
আর অনেক বেলার নানারকম মাছে নৌকা! বোঝাই করে ফেরে । তখন 
তো৷ কলকাতায় সমুদ্রের মাছ চালান আসত না, প্লেটের মত বড় টাদা- 
মাছ (পমৃফ্রেট ) আর গল্দাচিংড়ির “ঠাকুর্দা' রাক্ষুসে চিংড়িমাছ দেখে 
তে! আমরা অবাক । নানারকম মাছের সঙ্গে আবার ছু'চারটা অদ্ভুত 
জীবও জেলেদের জালে উঠে আসত । নরম থল্থলে “জেলি-ফিশ”, 
শহ্করমাছ তো হামেশাই দেখতাম । একবার একটা উজ্জল সবুজ রঙ্গের 
জন্তকে জেলেরা ছু'ড়ে দূরে ফেলে দির্লী। বাবা সেটাকে ভাল করে 
দেখবার জন্য কাছে নিয়ে ঝুঁকতেই তারা &েঁচিয়ে উঠল, “বিদ্ধিব-অ, 
বিদ্ধি-অ।” দেখতে অমন শুন্দর হ'লে কি হয়? ওকে ছু'লেই 
নাকি হুল বিধিয়ে দেয়। একদিন একগাদা শামুক বিশ্ুক কুড়িয়ে 
বাড়িতে এনে জল দিয়ে ধুচ্ছি, হঠাৎ একটা শামুকের মধ্যে থেকে 
একট! অন্তুত জীব বেরিয়ে এল । ঠিক কীাকড়ার মত মুখ ও দাড়া, 
কিন্ত খোলা নেই। গা'টা নরম আর লম্বাটে হয়ে ডগাটা লেজের মত 
হয়েছে। শামুক তো নয়ই, কাকড়াও তে! কখনে! এরকম দেখিনি । 
বাবা বললেন, ওর নাম “হামিট ক্র্যাব' অর্থাৎ সন্যাসী কীাকড়া । 
ওর এ নরম শরীরটাকে শক্রর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য ও কোনো 
শামুকের খোলের মধ্যে চুকে আশ্রয় নেয়। ঠিক যেন গুহার মধ্যে 
সঙ্্যাসীঠাকুর । 

ওদেশের ভাষা বুঝতে প্রথম প্রথম মুশকিল হচ্ছিল, কিন্তু একটু 
মন দিয়ে চেষ্টা করলেই বাংলাভাষার সঙ্গে ওর অনেকটা সাদৃশ্য বোঝ! 


১১১ 


যায়, আর আন্পদিনের মধ্যেই বলতে পারা না যাক্‌, মোটামুটি বুঝতে 
কষ্ট হয় না। আমাদের বাম়ুনঠাকরুগ প্রথম দিন গিয়েই ওদেশী নতুন 
ঝিকে কাজ বোঝাতে গেল। বাংলাভাষ! সে বুঝতে পারছে না দেখে 
মেগে বলল, “জেতের মু--খে আগুন!” সেই বামুনঠাকরুণ ক'দিনেই 
সার-কখার-বাইগল ( কচু, কুমড়ো, বেগুন ) শিখে নিল, আর এমন 
কাইকি-মাইকি করে মাছের দরদস্তরী আরম্ভ করল যে, মেছুনীরা তো 
হেসেই গড়াগড়ি। ওরা কথার শেষে হ্সস্ত উচ্চারপ করে না। 
ভাতকে আমাদের মত ভাত না বলে, বলে ভাত.-অ, ডালকে বলে 
ডালি, ইকৃমিক (কুকার )টকে বলত ইকিমিকি। আমকে ওদেশে 
বলে আম্ব, কলাকে কদরী ( কদলী ), কাঠালকে বলে পনস( কাঠালের 
সংস্কৃত নাম )। পেঁপে ওদেশে ইব বড় বড় হয়, আর খুব মিষ্টি; 
মামটাও . বেশ জমকালো-_“অন্্তভণ্ডা” অর্থাৎ অস্বত-ভাণ্ড। তুর্য- 
গ্রহণের সময় সকলে কালে! কাচ চোখে দিয়ে দেখছে, ঝি-ও দেখতে 
চাইল। তার একটা চোখ কান! ছিল, এক টুকরো কাচ তার হাতে 
দিতে সে ভাল চোখুটায় লাগিয়ে খুব মন দিয়ে দেখতে লাগল । “কি 
রকম দেখছো৷ 1 জিজ্ঞাসা করাতে সে গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, “মু তো! 
এক চক্ষুরে দেখুচি, মু অধ-খণ্ড দেখুচি !” | 

ওখানে খাঁটিছুধ পাওয়া মুশকিল হচ্ছিল, একটা ভাল গরু কেনা 
হ'ল। আমাদের বাড়ির সামনের মাঠে কারা যেন রোজ ছটো প্রকাণ্ড 
ষাড় ছেড়ে দিয়ে. যেত, তারা সমস্তক্ষণ লড়াই করত। মাটিতে পা 
ঠুকে গর্জন করত, হঠাৎ শিংয়ে শিং বাধিয়ে মল্যুদ্ধ আরম্ভ করে দিত। 
সারাদিন এই রকম চলত । একদিন ছুপুরবেলায় আমর! ভিতরের 
বারান্দায় বসে খেলা, করছি, হঠাৎ ফৌস্‌ ফৌস্‌ শব্দ শুনে চেয়ে দেখি, 
সেই ষাঁড় ছটো উঠোনের খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকে এসে গরুর গামল! 


১২৯৭ 


থেকে সপাৎ সপাৎ করে জাব,খাচ্ছে। গরু বেচারা ভয়ে এক পাশে 
সরে দাড়িয়েছে । আমরা চেঁচামেচি করতেই ঠাকুর-চাকররা লাঠি 
নিয়ে ছুটে এল, ষাঁড় ছুটো তাড়া খেয়ে খিড়কি দরজা দিয়ে না 
বেরিয়ে খটাখটু সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে সোজা বাবার ঘরে গিয়ে 
ঢুকল। বাবার অসুখ, খাটে শুয়ে আছেন, ছুই ষাঁড় সেই খাটের 
চারদিকে তাগুব-নৃত্য জুড়ে দিল। অনেক হৈ-চৈ, তাড়াহুড়োর পর 
তারা বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে লাফিয়ে মাঠে পড়েই লেজ তুলে 


০ 





ৃ ৮০০ ২ 
চি -%% ৮৮৫) 
পা [দু £ ২ £ / 

.-“ধটাখট্‌ সিড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে সৌজ। বাবার ঘরে". 
উধ্বশ্বাসে দৌড় দিল । তারাই বেশী ঘাবড়েছিল, না আমরা, তা 
বলতে পারি না। 

একদিন মন্দির থেকে “মহাপ্রসাদ' আনিয়ে খাওয়া হ'ল। প্রকাণ্ড 
প্রকাণ্ড হাড়ি, একটার উপর একটা চাপিয়ে দমে রান্নার মত করে নাকি 
রান্ন৷ হয়, ভারি নুম্বাছু খেতে । রোজ হাজার হাজার লোকের, জন্য 
রান্না হয়ঃ ভাতের ফেন নল দিয়ে এসে নীচে একটা লম্বা চৌবাচ্চার 
মধ্যে জমা হয়-_রাজ্যের গরু এসে জোটে সেই ফেন খেতে । মহাপ্রসাদ 


“৯১৩ 
৮8 


লোকে অতি পবিত্র মনে করে, তার একটি কণাও কেউ ফেলে না । 
তীর্থ সেরে দেশে ফিরবার সময় যত্ব করে প্রসাদ নিয়ে যায়, ছ"টি ছ'টি 
করে সবাইকে বিতরণ করে, ভক্তিভরে মাথায় ঠেকিয়ে প্রত্যেকে ছ'চার 
দানা শুকনে। প্রসাদ মুখে দেয় । একটা নিয়ম বেশ সুন্দর | প্রসাদের 
বেলায় জাত বিচার নেই। আমাদের ঠাকুর-চাকররা কেউ কারো 
সঙ্গে বসে খেত না, কিন্তু প্রসাদ যেদিন এল, বাঙ্গালী, বেহারী, ওড়িয়া, 
বামুন-শুদ্র সবাই পাশাপাশি খেতে বসে গেল। বামুনঠাকুরটির 
ছোয়াছু'য়ির বিচারটা একটু বেশী ছিল, আক্ত সবাই নিজের পাত থেকে 
ভাত তুলে ভার পাতে দিল । মা বললেন, “এই তো কেমন সুন্দর 
সবাই একসঙ্গে বসে খাচ্ছ, রোজ এ রকম পার না?” ঠাকুর বলল, 
“এ যে জগন্নাথের প্রসাদ, এ তো কিছুতেই অপবিত্র হয় না।” মা 
জিজ্ঞাসা করলেন, “জগন্নাথ তো সমস্ত জগতের প্রভু, সব অন্নই তো 
তারই দান, সবই কি তার প্রসাদ নয়?” ঠাকুর মাথা চুলকে বলল, 
“হ্যা, সে তো ঠিক কথা । সেতো ঠিক কথা ।” 

বামুনঠাকুরের নাম ছিল “ক্রুষ্ণ' অর্থাৎ কৃষ্ণ । বেশ রান্না করত» 
কিস্ত মাছ যতই দাও তার হাতে অর্ধেক হয়ে যেত। একদিন 
পরিবেশন করতে গিয়ে মা বললেন, “মাছ এত কম কেন, ঠাকুর 1৮ 
ঠাকুর তাড়াতাড়ি বলল, «বেড়ালে খেয়ে গিয়েছে, মা !” নানকু অমনি 
খিলখিল করে হেসে বলল, “হ্যা মা, আমি দেখেছি, কেষ্টো-বেড়ালে 
মাছ খেয়েছে ।» ছোট্ট ছেলের কথায় সবাই হেসে উঠল আর কে 
লঙ্জা পেয়ে ঘর থেকে পালাল । 


১১৪ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 





অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ 


বাবারা সাত ভাইবোন আর তাদের ছেলেমেয়েরা মিলে, আমরা 
বেশ বৃহৎ পরিবার ছিলাম। তাঁর মধ্যে অনেকেই কলকাতায় 
থাকতেন, কেউ কেউ দেশে থাকতেন, কেউ বা দূরদেশে চাকরি 
করতেন। কোনো কিছু উপলক্ষ্যে যখন সবাই এক সঙ্গে মিলতাম, 
তখন যেন এক সমারোহ ব্যাপার হ'ত । একবার সবাই মিলে দেশে 
গিয়েছি, বাড়িতে লোক যেন ধরে না। চারদিকে হাসি, গন্প, আনন্দ, 
কোলাহল, __তার মধ্যে ঠাকুরমা একটা পুরনো দিনের গল্প বললেন । 
আমাদের প্রপিতামহ ( ঠাকুরদাদার বাবা ) অল্প বয়েসে মারা যান। 
তার মৃত্যুর সময়ে ঠাকুরদাদার মা তাদের একমাত্র পুত্র শিশু ঠাকুর- 
প্রপিতামহ নাকি বলেছিলেন, “এই যে তোমার একটি' রইল, এই এক 
থেকেই তোমার এক শ' হবে।” ঘরভরা লোকের দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে 
চেয়ে ঠাকুরমা! বলেছিলেন, “তিনি যদি এখন বেঁচে থাকতেন তাহলে 
দেখতেন, তার সে আশীর্বাদ সফল হয়েছে--তার বংশের ছেলেমেয়েতে 
আক্ত তার ঘর ভরে গিয়েছে” সেই বংশ আর পরিবারের গল্প এখন 
কিছু বলি। 

সে প্রায় চার শ বছর আগেকার কথা । রামশ্্ন্দর দেও বলে 
একটি যুবক তার পৈতৃক নিবাস নদীয়। জেলার চাকদহ গ্রাম ছেড়ে 


১১৫ 


ভাগ্য-অন্বেষণে বেরিয়েছিলেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি পূর্ব 
বাংলায় সেরপুরে এলেন। সেরপুরের জমিদারবাড়িতে যশোদলের 
রাজা" গুণীচন্দ্র যুবকের সুন্দর চেহারা আর তীক্ষবুদ্ধি দেখে 
মু্ধ হয়ে তাকে যশোদলে নিয়ে এলেন। সেখানে ঘরবাড়ি করে 
দিলেন, জমিজমা দিলেন, তারপর তার সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে 
দিলেন। সেই থেকে রামসুন্দর দেও যশোদলবাসী হলেন। তার 
বংশধররাও অনেকদিন যশোদলে ছিলেন, পরে ব্রহ্মার নদীর ধারে 
মস্ুয়া গ্রামে এসে স্থায়ী বসবাস করেন । 

_ -ক্রমে তারা একদিকে যেমন চাকরি ইত্যাদি করে সাংসারিক উন্নতি 
করলেন, তেমনি তাদের মধ্যে অনেকে বিদ্যায় ও চরিত্রে উন্নত হয়ে 
লোকের কাছে শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভ করলেন । তাদের আসল পদবী 
“দেও' ( দেব ) মুসলমান সরকারে কাজ করার ফলে হল “রায়'। 
কেউ কেউ 'খাসনবিশ' “মজুমদার' ইত্যাদিও লিখতেন । 

এই বংশের রামকাস্ত মজুমদার নানা ভাষায় পণ্ডিত, গান-বাজনায় 
পারদর্শা আর অসাধারণ বলশালী ছিলেন। তার গায়ের জোর সম্বন্ধে 
অনেক মজার গল্প শোনা যায়। এক ঝুঁড়ি খই আর একটি আস্ত কাঠাল 
নাকি তার জলযোগ ছিল । একদিন তিনি ঘরের দাওয়ায় বসেছিলেন, 
হঠাৎ একটা বুনোশুয়োর এসে তাকে আক্রমণ করল। বজ্তমুষ্টিতে 
শুয়োরের চোয়াল চেপে ধরে তিনি চীৎকার করে ডাকলেন । শুনেই 
তার ভাইপো ছুটে এলেন, তারপর খুড়ো-ভাইপোতে মিলে বিনা-অস্ত্র 
শুধু খড়মপেটা করেই বুনোশুয়োরের দফা শেষ করলেন। একবার 
রামকান্ত একটা গরু কিনলেন, তেমন সুন্দর গরু ও-অঞ্চলে কেউ 
দেখেনি । নদীর ওপারে একজন দূর্দান্ত ধনীলোক ছিল, গরুটা দেখেই 
তার ভারি লোভ হল। রামকাস্ত কয়েকদিনের জন্য ভিন্ন গ্রামে 
গিয়েছিলেন, সেই সুযোগে এ লোকটির অন্ুচরেরা তার গরু চুরি করে 


১১৪ 


নিয়ে গেল। ফিরে এসে গরু চুরির কথা শুনেই রামকাস্তর বুঝতে 
বাকি রইল না এ কার কাণ্ড। তখনই নৌকোয় নদী পার হয়ে সেই 
লোকটির বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, বাহির-বাড়ির আঙ্গিনায় তার গরু 
বাধা রয়েছে। সোজা গিয়ে এক হাতে সামনের ছুই পা, অপর হাতে 
পিছনের ছুই পা ধরে গরুটাকে কীধে তুলে নিয়ে তিনি রওনা হলেন, 
কেউ তাকে বাধা দিতে সাহস করল না। ছুষ্ট লোকটি তখন বাড়ির 
ভিতরে ছিল, বাইরে এসে ব্যাপার শুনেই বিষম চোটপাট আরম্ত 
করল-_-“তোরা এতগুলো লোক থাকতে একটা মানুষকে আটকাতে 
পারলি না? যা, এখনি দৌড়ে যা।” রামকান্ত নদীর ধারে পৌছে 
চেয়ে দেখলেন যে কতগুলো ষণ্তা লোক তার দিকে ছুটে আসছে। 
গরুটাকে নৌকোর সঙ্গে বেঁধে তিনি ঘুরে দীড়ালেন। ঢালু পাড় বেয়ে 
প্রথম লোকটি নামতেই পা ধরে ঝুলিয়ে তুলে কাদার মধ্যে তার মাথ! 
গুজে দিলেন। দ্বিতীয় লোকটিরও এ দশা হতে দেখেই বাকি 
লোকগুলি উধ্বশ্থাসে দৌড় দিল। 

রামকান্তর ছেলে লোকনাথ রায় পণ্ডিত ও সাধক লোক ছিলেন । 
সংস্কৃত, আরবী, পারসী ভাষায় তার এমন অধিকার ছিল যে, এর মধ্যে 
যে কোনে ভাষার বই তিনি অন্য ভাষায় অনর্গল পড়ে যেতে পারতেন, 
বোঝাই যেত না যে অন্নুবাদ করে পড়ছেন । সংসারে তার মন ছিল না, 
তিনি যোগসাধনা করতেন । সাধন-ভজনের মাত্রা যখন ক্রমে বেড়ে 
চলল তখন রামকাস্তর ভয় হল, পাছে ছেলে সন্গ্যাসী হয়ে যায়। সেই 
ভয়ে একদিন তিনি লোকনাথের সাধনের গ্রন্থ আর অন্যান্য সমস্ত 
উপকরণ লুকিয়ে চুপি চুপি ব্রহ্মপুত্রের জলে ফেলে দিলেন । মনের 
হুঃখে লোকনাথ সেই যে শষ্যা নিলেন, আর উঠলেন না । তিন দিনের 
দিন তার মৃত্যু হল। ইনিই আমাদের প্রপিতামহ। 

লোকনাথ রায়ের একমাত্র পুত্র, আমাদের ঠাকুরদাদা কালীনাথ 


১১৭ 


রায়, উদার ভেজব্বী এবং সংস্কৃত আরবী ও পারসী ভাষায় পণ্ডিত বলে 
বিশেষ সম্মানিত ছিলেন। বড় বড় ব্রাক্মণ-পণ্ডিতদের বিচার-সভায় 
অনেক সময় তাকে মধ্যস্থ মানা হত ; মৌলবীরা কত সময়ে তার কাছে 
আরবী ফরমানের অর্থ বুঝবার জন্য আসতেন; আসল নাম কালীনাথ 
হলেও মুন্সী শ্যামসুন্দর' নামেই তিনি লোকের কাছে বেশী পরিচিত 
ছিলেন। কালীনাথ রায়ের পাঁচ ছেলে--সারদারঞ্জন, কামদারঞ্জন, 
মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞন, প্রমদারপ্ীন । 

জ্যেঠামশাই সারদারঞ্জন রায় একদিকে যেমন সংস্কৃত ও অঙ্কে 
পণ্ডিত, অন্যদিকে তেমনি শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট খেলোয়াড় বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন । 
আমাদের দেশে ক্রিকেট খেলার প্রচলন আর উন্নতির চেষ্টায় তিনি 
একজন অগ্রণী ছিলেন। সাহেবরা (ইংলগ্ডের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় 
ডব্লিউ. জি. গ্রেস-এর নামে) তার নাম দিয়েছিলেন ণব্লিউ, জি. 
অভ ইতিয়া” । 

ছোটবেলায় নাকি জ্যেঠামশাইয়ের পড়াশোনায় একেবারেই মন ছিল 
না। খেল! করে, গাছে চড়ে, সাঁতার কেটে দিন কাটাতেন। তবে 
বুদ্ধি আর স্মতিশক্তি প্রখর ছিল বলে একবার যা পড়তেন বা শুনতেন, 
তাই শেখা হয়ে যেত। মিষ্টি খেতে তিনি খুব ভালবাসতেন । এট্টান্স 
পরীক্ষার জন্য যখন ময়মনসিংহ শহরের স্কুলে পড়তে এলেন, তখন 
রোজ বিকালে পাঁচ পোয়৷ পাস্তয়া জল-খাবার খেতেন। এর ফলে 
অস্থুখে ভুগলেন, পড়াশোনা একেবারেই হল না। পাশ করতে পারবেন 
কিনা বড়ই ভাবনা! হুল। পরীক্ষার আগের দিন রাত্রে আশ্চর্য এক 
স্বপ্ন দেখলেন। তার বসবার জায়গা পরীক্ষার হলের কোন জায়গায় 
পড়েছে, কি রকম প্রশ্ন আসবে, স্বপ্নে স্পষ্ট দেখলেন। তার সীটের 
পাঁশে 'একখানা আস্ত ইট পড়ে আছে, তাও পর্যস্ত দেখলেন। তখনই 
ঘুম ভেঙ্গে গেল, তাড়াতাড়ি উঠে রাত জেগে প্রশ্নগুলো ভাল করে 


১১৮ 


দেখে নিলেন। পরদিন পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখলেন, হ্বপ্পে যা যা 
দেখেছিলেন সমস্তই একেবারে ঠিক। পরীক্ষায় পাশ করে তিনি বৃত্তি 
পেলেন। তার জীবনে আরো কয়েকবার নাকি স্বপ্ন আশ্চর্য রকম 
ফলেছিল। 

এবার ঢাকা! কলেজে ভি হয়ে সারদারঞ্জঁন একদিকে পড়াশোনা ও 
অন্যদিকে ক্রিকেট খেলা এবং ব্যায়াম-চর্চার দিকে মন দিলেন । ছাত্র- 
জীবনে যেমন খেলায় শ্রেষ্ঠ হয়েছিলেন, কলেজের অধ্যাপক হয়েও 
আলিগড়, ঢাকা, কলকাতা, যেখানে গিয়েছেন ছাত্রদের এক দিকে 
খেলা শেখাতেন। জ্যেঠামশাইয়ের বাড়িতে গেলে চারদিকে দেখতাম 
ক্রিকেট-ব্যাট হকি-স্টিক, মুণ্ডর, ডাম্বেল, মাছ ধরার ছিপ! 
কাকারাও সকলে ব্যায়াম করতেন, সকলেই ভাল খেলোয়াড 
ছিলেন। বাড়ির একটু বড় ছেলেদের জ্যেঠামশাই নিয়মমত 
ব্যায়াম করাতেন এবং খেলা শেখাতেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ 
বড় হয়ে খেলায় খুব নাম করেছে । বাড়ির চাকরদের তিনি কুত্তি 
শেখাতেন আর গায়ে জোর হবার জন্য তাদের হালুয়া খাওয়াতেন। 
প্রতিদিন তিনি হেঁটে গঙ্াস্ান করতে যেতেন, স্নান সেরে ভিজে 
কাপড় গামছায় বেঁধে নিজের হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে আসতেন । 

ছিপে মাছ ধরারও তার খুব শখ ছিল। ছুটির দিনে কাকাদের 
সঙ্গে নিয়ে মাছ ধরতে যেতেন । যেদিন বড় বড় মাছ পাওয়া যেত, 
বাড়ি বাড়ি ভাগ করে পাঠানো আর নিমন্ত্রণ খাওয়ানোর ধুম পড়ে যেত। 

ভাই-ফৌটার দিন সকালে আমরা সমস্ত ভাইবোনের! জ্যেঠা- 
মশাইয়ের বাড়িতে জড়ো হতাম। সেদিন আর দোকানের সন্দেশ 
রসগোল্লা নয়, থালাভরা কত রকম যে পিঠে-পুলি, লাড়ু) তক্তি, ছাচ, 
তার ঠিক নেই। 


১১৪ 


ঠাকুরমা! যখন কলকাতায় আসতেন তখন জ্যেঠামশাইয়ের বাড়ির 
প্রতি আকর্ষণ আমাদের বেড়ে যেত। ঠাকুরমাকে দেখবার আনন্দ, 
তাছাড়৷ তার হাতের রান্না খাবার লোভটাও বড় কম ছিল না। 
কত রকমের সেই সব “নিরামিষ-ঘরের তরকারী'র ম্বাদ এখনও মনে 
পড়ে। ঠাকুরমার হাতের তিলের লাড় দাদা এত ভালবাসত, 
যখনই দেশ থেকে কেউ আসত, ঠাকুরমা লাড়। পাঠাতে ভুলতেন 
না। বড় হয়ে দাদা যখন বিলাতে গিয়েছিল, সেখানেও ঠাকুরমার 
তৈরী তিলের লাড়ু তাকে পাসে ল করে পাঠি।নো হত। ঠাকুরমার 
যেমনি উচু মন ছিল, তেমনি ছিল তার দয়া-মায়া বুদ্ধি- 
বিবেচনা । সবাই তাকে ভালবাসত আর খুব মান্য করত। পাড়া" 
গায়ে বিধবা মানুষদের কত কঠিন নিয়ম উপবাস ইত্যাদি করতে 
হয়, ঠাকুরমা নিষ্ঠার সঙ্গে সে সমস্ত পালন করতেন, কিন্ত তিনি 
কুসংস্কারের বশ ছিলেন না। মা'র কাছে গল্প শুনেছি, মা যখন 
নতুন বৌ হয়ে প্রথ্থম দেশে গিয়েছিলেন তখন মেয়েদের জুতো পায়ে 
দেওয়া দূরের কথা, জামা গায়ে দেওয়াও চল্‌ ছিল না। মা একে 
শহরের মেয়ে, তায় ব্রাহ্ম, ঠাকুরমা বললেন, “তোমার তো৷ খালি- 
পায়ে' থাকা অভ্যাস নেই, অন্থুখ করবে-_তুমি জুতো পায়ে দিয়ো । 
তাতে কোনো দৌষ হবে না।” মা তাকে বুঝিয়ে দিলেন মা'র খালি- 
পায়ে থাকা অভ্যাস আছে, কোনে! অন্ববিধা হবে না। বাবারা 
কায়স্থ, মা ব্রাহ্ধষণের মেয়ে। দেশের গুরুজনেরা অনেকে মাকে 
তাদের পা ছুয়ে প্রণাম করতে দিতেন না। বলতেন, ৫না+ না, তুমি 
ব্রাঙ্মণ-কন্তা, পায়ে হাত দিতে নেই!» ঠাকুরমা হেসে বললেন, 
“বামুনের বেটিই হোক আর মুসলমানের বেটিই হোক, আমার 
বেটার বৌ যখন হয়েছে, আমি কেন পায়ের ধুলো দেব না৷ ?” 
ঠাকুরমা তিরাশি বছর বেঁচেছিলেন। প্রায় শেষ পর্যস্ত তার চুল 


১২৩ 


বিশেষ পাকেনি, দাত পড়েনি, পাতলা ছিপছিপে দেহখানি হুয়ে 
পড়েনি। বাংল! লেখাপড়া তিনি বেশ ভালোই জানতেন, ইংরাজী 
অবশ্য পড়েননি। একবার আমাদের একজন খুড়তুতো ভাই তার 
দাদাকে জিজ্ঞাসা করল, “ক্যাবেজ মানে কি ?” ঠাকুরমা শুনতে পেয়ে 
বললেন, “আ৷ কপাল ! তাও জানিস না ? ক্যাবেজ মানে বাধা-কপি ।৮ 

“আরে ! তুমি কি করে জানলে, ঠাকুরমা 1” 

ঠাকুরমা হেসে বললেন, “তোরা বুঝি ভেবেছিস আমি কিছুই 
জানি না?” তারপর পটপট করে কতগুলো ইংরাজী কথা আর 
তার মানে বলে গেলেন, নাতি-নাতনীদের মধ্যে হাসির ধুম পড়ে গেল । 

আমাদের বাব! ঠাকুরদাদার দ্বিতীয় ছেলে ছিলেন । তার নাম 
রাখ! হয়েছিল কামদারগ্রন। তার পাঁচ বছর বয়েসে তার এক কাকা, 
ময়মনসিংহের প্রসিদ্ধ উকিল ও জমিদার এই রায়বংশেরই হরিকিশোর 
রায়চৌধুরী, তাকে পোস্বপুত্র নেন। সেই থেকে তার নাম হ'ল 
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী । তার কয়েক বৎসর পরে হরিকিশোর 
রায়চৌধুরীর নিজের একটি ছেলে হ'ল, তার নাম নরেন্দ্রকিশোর 
রায়চৌধুরী ( গোরাকাঁকা )। ইনি দেশেই থাকতেন এবং জমিদারী 
দেখাশোনা করতেন । 

তৃতীয় ভাই মুক্তিদারঞ্জন রায় ( স্থন্দরকাকা ) আর চতুর্থ ভাই 
কুলদারঞগন রায় ( ধনকাকা ); ছুজনেই খুব ভাল ক্রিকেট খেলোয়াড় 
ছিলেন। সুন্দরকাকার গায়ে যে অসাধারণ জোর ছিল, তার চেহারা 
দেখে তা" বোঝা যেত না। ঠাণ্ডা মানুষ, ধীরে কথা বলেন, মুদ্ু 
হাসেন । পুরনে৷ দিনের অনেক গল্পই তার কাছে শুনেছিলাম আর 
শুনেছিলাম তার নিজের ছেলেবেলার ছৃষ্টমী ও ছুরস্তপণার গল্প । সে 
গল্প বলবার সময়ে তার মিটি-মিটি হাঁসির মধ্যে সেই হৃষ্ট, ছেলের্টাকে 
তখনও চেনা যেত । 


১২১ 


_ কুলদারঞন রায়ের নাম বাঙলার শিশু-দাহিত্যে বেশ. পরিচিত । 
তার “পুরাণের গল্প”, “বেতাল. পঞ্চবিংশতি” বত্রিশ সিংহাসন অজ্ঞাত 
জগৎ, “বাস্কারভিল কুকুর' ইত্যাদি বই ছোটদের খুব প্রিয় । 

ছোট কাক! প্রমদারঞরন রায়ও ভাল খেলোয়াড় ছিলেন, কিন্ত 
চাকরি উপলক্ষ্যে দূরদেশে ঘুরতে হত বলে খেলার ন্ুঘোগ বেশীদিন 
পাননি । তবে ক্রিকেট খেলার চিহ্ন তার সর্বাঙ্গে লেখা ছিল- সামনের 
ছুটি দাত ভাঙ্গা, হাতের ছুটো৷ আঙ্গুল ভাঙ্গা, কাধের হাড় (কলার 
বোন ) ভাঙ্গা, হাটু ভাঙ্গা । ছোট কাকা চমতকার গল্প বলতে পারতেন । 
তার কাছে “থা মাক্কেটিয়ার্স, এএল্যান কোয়ার্টারম্যান', “কিং 
সলোমন্স্‌ মাইন্স্‌*, “এরিক্‌ ব্রাইট আইজ, ইত্যাদি কত গল্পই আমরা 
ম্ত্রমুদ্ধের মত শুনতাম--আবার যখন তিনি “সার্ভে অভ ইণ্ডিয়া'র কাজে 
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ও বার্মার হুর্গম পাহাড় ও 
গভীর জঙ্গলে ঘ্বুরতেন, দেখানকার কত বিপজ্জনক ঘটনা আর বিচিত্র 
অভিজ্ঞতার গল্পও কম রোমাঞ্চকর ছিল না । তার কিছু নমুনা তার 
“বনের খবর' বইয়ে আছে। ছোট কাকার হাসিটি ছিল শুনবার 
মত। এমন চমৎকার প্রাণখোলা হাসি খুব কম শুনেছি। বিদেশ 
থেকে যখন বাড়িতে আসতেন, হা-হা-হা-হা হাসিতে বাড়ি মাতিয়ে 
বাখতেন। 

বড় পিসীমা আর তার ছেলেমেয়ের দেশেই থাকতেন ; ছোট 
পিসীমারা আমার্দের কাছেই একটা বাড়িতে থাকতেন । পিসীমার 
চৌদ্দটি সম্তানের মধ্যে অনেকের জন্ম তখন হয়নি, তবু তখনও তার 
বাড়িটি' সর্বদা শিশুর কল-কাকলিতে পুর্ণ থাকত । সে বাড়ির তিন- 
তলায় লম্বা একটি ঘরে পিসেমশাই হেমেন্্রমোহন বস্থ ( এইচ. বোস ) 
তার' লেবরেটরী করেছিলেন, সেখানে বসে তিনি নানারকম সুগন্ধি 
তৈরীর পরীক্ষা করত্বেন। ঘরটার দিকে গেলেই স্গন্ধ ভূরভুর করত । 


১২২ 


কত রকমার্ধি শিশি বোতল, রাশি রাশি ফুল, চোলাই করবার যন্ত্র, বড় 
বড় পাথরের খল ও হামানদিস্তা ; এক. কোণে একটা সোডা তৈরীর 
কল, দে রকম আমরা আগে কখনও দেখিনি । হাতল টিপলেই ভুস্‌- 
ভুস্‌ করে নল দিয়ে সোডা-ওয়াটার বেরোত, সিরাপ মিশিয়ে আমাদের 
খেতে দিতেন, রুমালে জামায় সুগন্ধ এসেন্স দিয়ে দিতেন । ঘরটা যে 
আমাদের খুব পছন্দ ছিল, তা' বুঝতেই পারো ! ভারি আমুদে আর 
শৌখিন মানুষ ছিলেন পিসেমশাই । কত রকম শখই যে ছিল তার । 
গান বাজনার শখ, ফটোগ্রাফীর শখ । প্রথম মোটর চড়েছিলাম পিসে- 
মশাইয়ের গাড়িতে--কলকাতা শহরের মোটর গাড়ি তখন এক হাতের 
আন্কুলে গোনা যেত, রাস্তায় মোটর গেলে লোক হা করে চেয়ে থাকত । 
ফনোশ্রাফ (গ্রামোফোন ) প্রথম পিসেমশাইয়ের বাড়িতেই দেখি, রেকর্ডও 
তিনি নিজেই তৈরী করতেন । তখনকার রেকর্ডগুলো এ রকম চ্যাপ্টা 
গোল ছিল নাঃ চোঙ্গার মত হ'ত। দ্বিজেন্দ্রলালের গাওয়া তার হাসির 
গান, রবীন্দ্রনাথের গাওয়া “বন্দে মাতরম্” গান পিসেমশাইয়ের নিজে- 
তোলা রেকর্ডে শুনেছিলাম, আর শুনেছিলাম ছোট কাকার সেই হাসির 
রেকর্ড । হাসির রেকর্ড আরো শুনেছি, কিস্ত ছোট কাকার সে হাসি 
একেবারে অতুলনীয় । ঠিক সে রকমটি আর কোথাও শুনলাম না। 

বাবা, ধনকাকা, ছোট কাকা, ছোট পিসীমা ও পিসেমশাই ব্রাহ্ম 
হয়েছিলেন । দাদামশাই দ্বারকানাথ গাঙ্ুলীও ব্রাহ্ম ছিলেন । আমাদের 
দাদামশাই যখন মারা যান তখন আমরা খুব ছোট, তাই তার কথা 
খুব স্পষ্ট মনে নেই । মা'র বালিকা-বয়েসেই তাঁর মা মারা যান, সুতরাং 
দিদিমাকে আমরা চোখে দেখিনি । 

মা যখন তার বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রথম কলকাতায় এগার 
তখন কড়য়৷ অঞ্চলে একটা বাড়িতে তারা থাকতেন। অনেক দিন 
পরে, একবার আমরা সেই রাস্তা দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলাম, বাবা 


মাকে বললেন, “দেখ তো, তোমাদের সেই বাড়িটা চিনতে 'পারো কি 
না?” ঘোড়ার গাড়ি আস্তে আস্তে চলেছে, মা ছু'ধারে চেয়ে দেখছেন । 
কয়েক বংসরে জায়গাটার অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তবু একটা বাড়ি 
দেখেই মা'র চেনাচেন! মনে হল। তারপর তার উঠানে সতেজ কাঠাল 
গাছটা দেখে আর সন্দেহ রইল না। এই গাছটা দিদিমা! নিজের হাতে 
পু'তেছিলেন, রোজ জল দিতেন আর খুব যত্ব করতেন । মা জিজ্ঞাসা 
করেছিলেন, “এ গাছ কতদিনে বড় হবে, মা? আমরা কি তখন এখানে 
থাকবো ? কাঠাল খেতে পাবো ?” দিদিমা বলেছিলেন, “আমরা 
যদি নাও থাকি, আর কেউ তে! থাকবে । তারাই এ গাছের ফল 
খাবে, এর ছায়ায় বসবে ।” সেই গাছ এখন কত বড় হয়েছে! মা 
বললেন, “এখন কার! এ বাড়িতে আছে, চিনি না তো। না হলে এ 
গাছতলায় গিয়ে একটু বসতাম !” কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তিনি সেদিকে 
চেয়ে রইলেন, শ্যামল ছায়াশীতল সেই গাছটির মধ্যে যেন তিনি তার 
মায়ের স্সিপ্ধ কোমল রূপেরই ছবি দেখতে পেলেন । 

আমরা জন্মাবধি যে-দিদিমাকে জানি, তিনি যে মা'র বিমাতা, 
ছোটবেলায় সে কথা আমাদের জান! ছিল না। প্রথম যেদিন সে কথ! 
শুনলাম, টুনী অবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “সে কি! দিদিমা 
বুঝি তোমার নকল মা?” “নকল মা" কথাটা নিয়ে খুব হাসাহাসি 
হল। 

দিদিমা ছিলেন নতুন যুগের মানুষ । আমাদের দেশের মেয়েদের 
উন্নতির পথে নানাদিকে তিনি অগ্রণী ছিলেন। তিনি এবং চন্দ্রমুখী 
বশ্ন ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা-গ্র্যাজুয়েট, বাঙলা দেশের তিনি 
প্রথম মহিলা-ডাক্তার, কংগ্রেসের প্রথম মহিলা-প্রতিনিধিদের মধ্যে 
তিনি ' একজন ছিলেন। অনাধারণ কাজের লোক ছিলেন তিনি! 
ডাক্তারিতে তার খুব সুল্লাম ও পসার ছিল, নানারকম দেশ-সেবা ও 


১২৪ 


সমাজসেবার সঙ্গে তার যোগ ছিল, তার উপরে দাদামশ।ইয়ের মৃত্যুর 
পরে সাতটি সন্তানকে মানুষ করবার ভার সম্পূর্ণ তার হাতেই পড়েছিল । 
রান্না, সেলাই প্রভৃতি ঘরের কাজও তিনি খুব ভাল রকম জানতেন । 
একটুও সময় তিনি নষ্ট করতেন না । তখন তো মোটর গাড়ি ছিল না, 
শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত রোগী দেখে বেড়াতে ঘোড়ার গাড়িতে 
অনেক সময় লাগতো । সেই সময়টা তিনি লেস বুনে কাজে লাগাতেন। 
একদিকে খুব সাহসী আর তেজস্িনী, অন্যদিকে ভারি আমুদে মানুষ 
ছিলেন তিনি। যেখানে বসতেন হাসি গল্পে একেবারে মাতিয়ে 
তুলতেন। সঙ্গে সঙ্গে হাতও চলত। আমরা হা করে ভার গল্প 
শুনতাম আর তার সুন্দর আঙ্ুলগুলির খেল! দেখতাম । কি অদ্ভুত 
তাড়াতাড়ি কি সুন্দর সূক্ষ্ম লেস বোনা হচ্ছে । মামা-মাসীরা আমাদেরই 
সমবয়েসী, আর অনেক দিন এক বাড়িতেই ছিলাম, কাজেই খুব ভাব 
ছিল । 

আমাদের বাড়িটা ছিল আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, অতিথি অভ্যাগত 
সকলেরই সুখের মিলনের জায়গা--“বারোমাসে তেরে! পার্বণে”র মত 
ছোটখাটো! কত আনন্দের উৎসব নিত্য লেগে থাকত । ভগবানের নাম 
গানে, প্রাণখোলা আদর যত্বে, হাসি আলাপে, গান বাজনায় সকলেই 
কত তৃপ্তি ও আনন্দ পেতেন । বাবার এক বন্ধু বলতেন, “এ বাড়ির 
মান্ুষগুলি সব সময়েই হাসছে-_বাড়িটাও যেন হাসছে !” 


১২. 


ছেলেবেলার দিনগুলি 
রি 


77) 
এছ ই 1. 


উনবিংশ পরিচ্ছেদ 


দাদা আর মনি আগেই আমাদের সেই পুরনো স্কুল সিটি স্কুলে 
ভত্তি হয়েছিল, এবার স্ুরমামাপী আর দিদি একসঙ্গে এণ্টান্স 
পরীক্ষায় পাশ করে বেখুন কলেজে ভর্তি হল ; সেই সঙ্গে টুনী আর 
আমিও বেখুন স্কুলে পড়তে এলাম । অনেক বড় স্কুল, তার মস্ত 
ভারি ঘোড়ায়-টানা বাসগুলো গুম গুম শব্দে রাস্তা কাপিয়ে চলে, 
মোটা মোটা থামওয়ালা প্রকাণ্ড বাড়ি দেখে হিংসা করে অন্যান্য স্কুলের 
ছেলেরা ছড়া বানায়-_ 
“বেথুন কলেজ 
হ্াজ নো নলেজ 
' বড়া বড়া থাম 
কুছ নেই কাম!” 
আমাদের কিন্তু সেই পুরনো স্কুলের দিকে, ছোটবেলা থেকে চেনা 
সেই সব টিচার ও বন্ধুদের দিকেই মন টানত। তবে এখানকার একজন 
মাস্টারমশাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে । তিনি বেশ ভালই পড়াতেন, 
কিন্তু একেবারে মাথা-পাগল] মানুষ। ক্লাসে কোনো মেয়ে আন্তে 
আস্তে লিখলে খি'চিয়ে উঠতেন, “কাছিমডা !” ( অর্থাৎ কাছিমের 
মতই জান্তে চলে ।) আহলাদী মেয়েকে বলতেন, “কার্তিকচন্দর 1” 
আর ন্যাকা মেয়েকে সরু গলায় আধ-আধ স্বরে বলতেন, “আম- 





১২৭ 


ছাগলের মাংছে দিয়ে অছগোল্লার অছ দিয়ে -উতি কাণ্ডও 1” কখন যে 
কিসে ক্ষেপে উঠতেন, তার ঠিক নেই, আবার একটুতেই গলে জল 
হয়ে যেতেন। ভারি নরম ছিল মনটা । একদিন সামান্য কারণে রেগে 
আমাকে আর আরো ছটি মেয়েকে নিয়ে নীচের ক্লাসে বসিয়ে দিলেন । 
খানিক পরে রাগ আপনিই পড়ে গেল, তখন একগাল হেসে ডাকতে 
এলেন-_“চল মা, ক্লাসে চল 1” অন্য ছুজন মেয়ে উঠে 'চলে গেল, 
আমি কিন্তু হাড়িমুখ করে বললাম, “আমি যাব না তো! আপনি 
আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, আমি এখানেই থাকব।” তখন কত 
সাধ্যসাধনা-_“লক্ষ্মী মা, সোন! মাঃ রাগ করিস না। দেখ মা, কু-পুত্র 
যদি বা হয়, কু-মাতা কখনো নয় 1? মা আর ফিরেও তাকায় না ! 
হঠাৎ কেমন একটা সন্দেহজনক শব্দে চেয়ে দেখি সত্যি সত্যি ফুঁপিয়ে 
কাদছেন, ছু চোখ দিয়ে জল পড়ছে । কি আর করি! তখন উঠতেই 
হল। 
দাদাদেরও একজন “পাগলা মাস্টার' ছিলেন। উক্কোথুক্কো ঝাঁকড়া 
চুল আর “গহন দাড়ি বদন ঘেরা'-_সেই দাড়ি থেকে ছারপোকা বার 
করে ক্লাসের টেবলে ছাড়তেন। চেহারাটা বিভীষণ হলেও মানুষটি 
ছিলেন ছেলেমানুষের মত। তাঁর অনেক মজার গল্প দাদার কাছে 
শুনতাম । 

একদিন তিনি ক্লাসে একজন হুষ্ট ছেলেকে মারতে গেলেন, ছেলেটা 
অমনি উধ্বশ্বাসে দৌড় দ্িল। মাস্টারমশাইও পিছনে তাড়া 
করলেন । স্কুল-বাঁড়িতে ছুটো সিঁড়ি-_রোগ! ছেলেটা! তরতর করে: 
এ সিড়ি দিয়ে চারতলা থেকে একতলায় নামছে, আর ও সিঁড়ি দিয়ে 
একতলা থেকে চারতলায় উঠছে । পিছনে ছুমছ্ধম করে ঝড়ের মত 
আসছেন মাস্টারমশাই। ধরবে কি, ছুধার থেকে সবছেলেরা 
বেরিয়ে হাঁ করে দেখছে খানিক পরে হাপরের মত হাঁপাতে হাপাতে 


১২৮ 


ছেলেটার ঝু'টি ধরে যখন ক্লাসে নিয়ে এলেন, বেহায়া ছেলেটা 
একগাল হেসে সগর্বে বলল, “আমি নিজেই ধরা দিয়েছি, স্যার 
আমাকে ধরতে পারেন নি।” মাস্টারমশাইও তখন হেসে ফেলে 
ছাত্রকে ছেড়ে দিলেন । 

আরেক দিন হলঘরে বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে, মাস্টারমশাই দেখতে 
পেলেন একটি ছেলে যেন ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, আর 
কোলের উপর কিছু রেখে মাথা নিচু করে কি যেন করছে। নিশ্চয় 
টুকছে! ভেবে তিনি তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে বললেন, “তোর কোলে 
কিরে?” ছেলেটি চট করে জিনিসটা পকেটে পুরে বলল, “কই, 
কিচ্ছু না তো?” পকেটে হাত দিতেই ঠিক কাগজের মত খড়খড় করে 
উঠল । মাস্টারমশাই যত বলেন, “পকেটে কি আছে, দেখি?” 
ছেলে ততই প্রাণপণে পকেট চেপে ধরে বলে, «কিচ্ছু না স্যার, সত্যি 
বলছি কিচ্ছু না।” ততক্ষণে ঘরশুদ্ধ লোক হা করে সেদিকে তাকিয়ে 
রয়েছে । খানিক ধ্বস্তাধ্বপ্তির পর জোর করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে 
জিনিসটা টেনে বার করে তিনি বিজয়ী বীরের মত সকলের চোখের 
নামনে তুলে ধরলেন, কিন্ত পর মুহুর্তেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে 
গেল। সবাই চেয়ে দেখল, তার হাতে ছোট্ট একটি শালপাতার 
ঠোঙ্গা, তার থেকে টপ-টপ করে রস ঝরে তাঁর কনুই অবধি গড়াচ্ছে । 
টিফিন খেতে খেতে ঘণ্টা পড়ে গিয়েছিল, বেচার! রসগোল্লার মায়া 
ত্যাগ করতে না পেরে ঠোঙ্গার্ুদ্ধ নিয়ে এসে লিখবার ফাকে ফাকে 
লুকিয়ে সেটা খাচ্ছিল । 

দাদার আর মনির নতুন স্কুলে অনেক বন্ধু জুটে গেল। ছুজনেই 
পড়াশোনায় ভাল আর শিক্ষক ও ছাত্র--সকলেরই প্রিয় ছিল। 
ছোটবেলা থেকেই দাদা যেমন আমাদের খেলাধূলা সব কিছুরই পাণ্ 
ছিল, তেমনি বন্ধুবাঙ্ধব আর সহপাঠিদের মধ্যেও সে সর্দার হল। সর্দারি 


১২৪ 
৯1৫ 


করা মোটেই তার স্বভাব ছিল না, কিন্তু তার মধ্যে এমন কিছু বিশেষত্ব 
ছিল যার জন্য সকলেই তাকে বেশ মানত । দলের সকলে নিজে 
থেকেই যেন তাকে নেতা! বলে মেনে নিয়েছিল। তাকে সবাই 
ভাল বাসত, প্রাণ খুলে তার সঙ্গে আমোদ-আহলাদ করত, কিন্ত তার 
সামনে ছুষ্টমি করতে কেউ সাহস পেত না। বড়রাও তার কথার বেশ 
মূল্য দিতেন। 

দাদাদের স্কুলে একজন টিচার ছিলেন, খুব ভাল তবে একটু 
কড়া “পিউরিট্যান' গোছের মানুষ । সকলেই তাকে খুব শ্রদ্ধা করত। 
একদিন ক্লাসে তিনি ছেলেদের বায়োস্কোপ দেখার অনিষ্টকারিতার 
বিষয়ে অনেক কথা বললেন, তারপর দাদাকে এ বিষয়ে তার 
মতামত বলতে বললেন । দাদা উঠে বলল যে, তারও মনে হয় 
বায়োস্কোপ বেশী দেখলে কিম্বা বাজে বাজে ছবি দেখলে অনিষ্ট হয় । 
তবে ভাল ছবিও অনেক আছে, সেগুলি মাঝে মাঝে দেখলে তাতে বরং 
উপকারই হয়। শিক্ষকমশাই যেন একটু ক্ষুণ্ন হলেন । তিনি হয়তো 
আশা করেছিলেন যে, দাদ! বায়োক্ষোপ দেখার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধেই 
বলবে । ক্লাসের পরে দাদা তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “স্যার, 
আপনি কি কখনও বায়োস্কোপ দেখেছেন ?” তিনি বললেন, “না, 
আমি ওসব দেখি না ।” দাদা বলল, “আমি আপনাকে একটা ভাল 
ছবি দেখাতে চাই, আমার সঙ্গে যাবেন কি?” খানিক ইতস্তত করে 
তিনি রাজি হলেন। তারপর দাদ! তাঁকে একটা ভাল ছবি (যতদূর 
মনে পড়ে “লে মিজারেবল' ) দেখিয়ে আনল । সেই ছবি দেখে তিনি 
দাদাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, “তুমি আমার মস্ত একটা ভুল ভাঙ্গিয়ে 
দিলে। বায়োস্কোপের ছবি যে এত ভাল হয়, সে ধারণা আমার 
ছিল না।” 

আমাদের একজন আত্মীয় মাঝে ষাঝে দেশ থেকে এসে আমাদের 


১৩৩ 


বাড়িতে থাকতেন । ডিসপেপটিক মানুষ, মেজাজ ভারি চটা । আমরা 
ভয়ে ভয়ে ভার থেকে একটু দূরেই থাকতাম, সহজে কাছে ধেঁষফতাম 
না। একবার তিনি দেশে ফিরবার সময়ে একট৷ মাগুর মাছ নিয়ে 
যাচ্ছেন, পথে মাছের ঝোল ভাত খাবেন। চাকরকে দিয়ে একট! 
ছোট্ট টিনের মধ্যে মাছটাকে বেশ করে কর্ক-ন্ত্ুর মত পেচিয়ে পেঁচিয়ে 
ঢোকাচ্ছেন, দাদ! দেখতে পেয়ে বলল, “অতটুকু টিনের মধ্যে মাছটা কি 
করে আটবে? একটা বড় টিন নিলে হত না ?” 

তিনি ধমকিয়ে উঠলেন, “আবার কত বড় টিন নেব? এতখানি 
রাস্তা, এতবার ওঠানামা, কম হ্যা্লামা !” 

“তা বলে অতথানি রাস্তা ওটাকে টর্চার করতে করতে নিয়ে 
যাবেন ?” 

আর যায় কোথায় ! ভীষণ রেগে চিৎকার করতে আরম্ভ করলেন, 
“নিজেরা মাছ মেরে খাও না? আমার বেলায় যে বড় বলতে 
এসেছ ?” 

দাদার কিস্তু ধীরভাবে এ এক কথা : “মেরেই তো খাবেন, কিন্তু 
অমন করে টর্চার করবেন না।” শেষ পর্যস্ত তিনি বড় একটা টিন 
নিলেন, তবে দাদ সেখান থেকে নড়ল। 

ছাত্রদের জন্য প্রকাশিত খৃস্টান মিশনারীদের একখানা কাগজ দাদ! 
নিত। একবার সেই কাগজে শিক্ষিত মেয়েদের অত্যন্ত অভঙ্রভাবে 
নিন্দা করে একজন ছাত্রের লেখা একখানা চিঠি বেরল। সকালে 
সেটা পড়েই দাদা কাগজখানা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। প্রথমে 
কাগজের আপিসে গিয়ে পত্রলেখকের ঠিকানা নিয়ে তার বাড়িতে 
গেল : সে ছেলে স্বীকার করল যে, সে যা লিখেছে, সমস্তই মিথ্যা 
কথা। কারো উপর রাগ করে সে এ রকম লিখেছিল এবং সমস্ত 
কথ! প্রত্যাহার করে ক্ষম৷ চেয়ে একখান! চিঠি তখনই লিখে দিল । 


১৩১ 


সেই চিঠি নিয়ে দাদা সম্পাদক পাড্রীসাহেবের কাছে গেল, তাঁকে 
কাগজখান৷ দেখিয়ে বলল, «আপনাদের কাগজে এ রকম লেখা বেরোন 
বড়ই ছুঃখের এবং লজ্জার কথা ।” সাহেব ভারি অপ্রস্তত হয়ে 
বললেন যে, তিনি ক' দিন কলকাতায় ছিলেন না, তাতেই এ রকম হতে 
পেরেছে । তিনি দেখলে কখনই এ রকম অভদ্র চিঠি ছাপতে দিতেন 
না, এখনই তিনি এর প্রতিবিধান করবেন । ( পরদিনই এ কাগজে 
সেই লোকটির ক্ষমা চেয়ে লেখা চিঠিটা ছাপ! হয়েছিল, তার সঙ্গে 
সম্পাদকও ত্রুটি স্বীকার করে ছুঃখ প্রকাশ করেছিলেন । ) এত ঘুরে 
রোদে তেতে পুড়ে অনেক বেলায় যখন দাদা বাড়ি ফিরল, দাদামশাই 
€( নবধ্বীপচন্দ্র দাস ) সব শুনে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “শ্থ্যা, 
দ্বারিক গাঙ্গুলির উপযুক্ত নাতি বটে !” 

ফটোগ্রাফির শখ এসময়ে দাদার খুব হয়েছিল। মুন্দর সুন্দর 
ফটো তুলে ও মজার ছবি একে বিলাতে “বয়েজ ওন পেপার*, “চামস্‌, 
প্রভৃতি ছেলেদের কাগজে পাঠাত আর কত পুরস্কার ও প্রশংসাপত্র 
পেত। আমাদের কত রকমের ছবি দাদা তুলত; পাড়ায় অনেক 
বৌ মানুষ ছিলেন ধাঁদের ফটো তোলবার ভারি সাধ কিন্ত দোকানে 
গিয়ে ছরি ভোলাতে পারেন না, দাদা তাদের সকলের ছবি তুলে 
দিয়েছিল । 

গান ও কবিতার নকল বা! প্যারডি করতেও দাদা খুব ভালবাসত । 
স্কুলের প্রাইজের জন্য আমরা গান শিখছিলাম ৷ রবীন্দ্রনাথের গানে 
বর্ষা বর্ণনা হচ্ছে-_ 


বিশ্ববীণারবে বিশবজন মোহিছে 
স্থলে জলে' নততলে, বনে উপবনে, নদী-নদ 
গিরি গুহ! পারাবারে 
'আবাটে, মধ আনন্দ উৎসব নব 


৯৩২ 


_ তি গল্ভীয়, অতি গন্ভীর, দীল' 
| অন্বরে ডম্বর বাজে 
যেম রে প্রলয়রী শঙ্করী নাচে 
করে গর্জন নির্বরিগী সঘনে 
উন্মাদিনী সৌদামিনী রঙ্গগুরে নৃত্য করে অন্বর তলে । 


বৃষ্টি বেগভরে রাস্ত। গেল ভূবিয়ে 
ছাতা! কাধে, জুত! হাতে, নোংরা! ধোল! কালো, 
হাটু-জল ঠেলি চলে যতলোকে । 
রাস্তাতে চল! হুর মুক্ষিল বড় 
অতি পিচ্ছিল, অতি পিচ্ছিল, অতি পিচ্ছিল 
বিচ্ছিরি রাস্ত! 
ধরণী মহা-ুর্দম কার্ম-গ্রস্তা 
যাওয়া ছুক্ষর মুদ্িল রে ইস্কুলে 
সর্দি হর বৃদ্ধি বড় নিত্যি লোকে বস্তি ডেকে 
তিক্ত বড়ি থায়! 


১৩৩ 


ছেলেষেলার দিনগুলি 





| বিংশ পরিচ্ছেদ | 
একবার জন্মদিনে আমি স্ন্দঘর একটা খেলার টি-সেট উপহার 
পেলাম । বেশ কফি-পেয়লার মত বড় বড় পেয়ালাগুলো, তাই দিয়ে 
ছোট ছোট ভাইবোনদের একটা পার্টি দেবার ইচ্ছা হল। মা বললেন, 
ছোট্ট ছোট্ট খাবার তৈরী করে দেবেন আর দাদা তাড়াতাড়ি একটা 
মজার ছবি একে তার ব্লক করিয়ে গোলাপী কার্ডে ছাপিয়ে সুন্দর 
নিমন্ত্রণের চিঠি বানিয়ে দিল। শুধু তাই নয়, বাবার লেখা “কেনারাম 
ও বেচারাম' বলে একট হাসির নাটক “মুকুল' পত্রিকায় বেরিয়েছিল, 
ভাইদের নিয়ে.সেটা অভিনয় করে সবাইকে খুব আনন্দ দিল। খুব 
জমল আমাদের পার্টিটা । সেই থেকে ভাইবোনদের জন্মদিনের উৎসব- 
গুলো দাদার হাসির গান ও অভিনয়ে জমকালো হয়ে উঠল । 
আমর! খুব উৎসাহের সঙ্গে অভিনয়ের জোগান দিতাম । পুরনো 
জামা-কাপড়-পর্দা থেকে জোড়া-তাড়া গোঁজামিল দিয়ে পোশাক বানিয়ে 
দিতাম, নিজেদের মাথার চুল কেটে গৌঁফ-টিকি বানিয়ে দিতাম । 
সকলের উৎসাহ দেখে মা কিছু টাকা দিলেন, তাই দিয়ে দাড়ি গোঁফ 
পরচুল৷ ইত্যাদি কেনা হ'ল। 
দাদার বেঁটেবামন সাজা, সে এক দেখবার মত জিনিস ছিল! 
তু হাত লম্বা বেঁটেবামন টেবিলের উপর ফ্রাড়িয়ে আছে-_মন্ত মাথায় 
বিরাট পাগড়ি, হাটু পর্যস্ত ঝোলা বিশাল দাড়ি, চোখে কালো চশমা, 


১৩৫ 


চওড়া কাধ, প্রন বুক, সবপুষ্ট লম্ব! ছুই হাত, আর ক্ষুদে হাফপ্যান্ট 
পরা, বেবী শু ও মোজা পরা, ছোট্ট বেঁটে বেঁটে হুটি পা! যেমঙি 
অদ্ভুত মজার তার চেহারা, তেমনি মজার তার হেঁড়েগলায় বক্তৃতা 
আর তীক্ষ টাচাস্ুরে গান । দেখেশুনে সকলে হেসে গড়াগড়ি যেত। 

প্রকাণ্ড দাড়িটা৷ কেন! হবার পরে একদিন ভারি মজা হয়েছিল। 
দাদা তখন বেশ লম্বা! হয়েছে, সেই দাড়ি লাগিয়ে, চোখে কালো 
চশমা এটে, চোগাচাপকান পাগড়ি পরে তার চেহারাটা বেশ 
জাঁদরেল দেখাল। সেই পৌশাকে তার এক বন্ধুর বাড়িতে গেল। 
ছেলেবেলার বন্ধু, তার সবই তে৷ জানা আছে, কাজেই তার হাত দেখে 
ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান অনেক কিছু খবরই গণনা! করে বলে দিয়ে 
একেবারে তাক্‌ লাগিয়ে দিল! তারপর যখন নিজের পরিচয় ফাস 
করল, তখন বন্ধুর ভারি মজা! লাগল । সে বললে, ণ্চল্‌ তোকে মা'র 
কাছে নিয়ে যাই । মা'র ভারি হাত দেখানোর বাতিক |” মাকে গিয়ে 
বলল, মা, পাঞ্জাব থেকে একজন জ্যোতিষী এসেছেন, মস্ত পণ্ডিত 
লোক । বিলাত, আমেরিকা, সব ঘুরে এসেছেন, আশ্চর্য তার ক্ষমতা! | 
তাকে হাত দেখাবে ?” মা তো খুব রাজি। 

গম্জ্ীর সৌম্যমৃতি জ্যোতিষী ঘরের মাঝখানে বসে আছেন, বাড়ির 
লোকেরা তাকে ঘিরে বসেছে । একে একে সকলের হাত দেখে তিনি 
এমন সব কথ! বলে দিচ্ছেন যে সকলে অবাক হয়ে যাচ্ছে! (সবই তো 
তার জানা আছে। ) জ্যোতিষীর আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে বন্ধুর মায়ের 
এমনই ভক্তি হ'ল যে হঠাৎ তিনি জ্যোতিষীর পায়ে টিপ, করে এক 
প্রণাম করে ফেললেন । মায়ের বয়েসী ভদ্রমহিলা, তিনি পায়ে মাথা 
ঠেকাতেই তো “গণকঠাকুর' মহা অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি উঠে 
তাকে প্রণাম করল আর বন্ধু একটানে তার পাগড়ি, আরেক টানে 
দাঁড়ি খুলে ফেলে হেসে বলল, “এ--কাকে প্রণাম করলে, মা ?” 


১৩৬ 


মঝলেই কেমন বোক৷ বনে গেল, তারপর ৷ হাসিয় ধুম! ততক্ষণে 
দাদা সোজ৷ বাড়িতে পিষ্টান দিয়েছে । 

এতদিন ছোটদের জন্তা ষেসব নাটক ও গল্প বইয়ে কিনব পত্রিকায় 
বেরত, তাই নিয়েই অভিনয় হত, এবার দাদা নিজেই হাসির নাটক 
লিখতে আরম করল। সব-্্রথমে হুল “রামধন বধ' নামে ছোট্ট 
একটা নাটক । র্যাম্স্ডেন্‌ (রামধন ) সাহেব মস্ত সাহেব, আমল 
সাহেবর৷ তার কাছে কোথায় লাগে । “নেটিভ. নিগার? দেখলেই সে 
নাক মিটকোয়, পাড়ার ছেলেরাও তাকে দেখলেই ঠেঁচায়_এবন্দে 
মাতরম্‌!” আর সে রেগে তেড়ে মারতে আসে, বিদৃদুটে গালাগালি 
দেয়, পুলিস ডাকে । এহেন “সাহেব কি করে ছেলেদের হাতে জব্দ 
হল, তারই গল্প । যেমন মজার অভিনয়, তেমনি মজার গান । বিষয়টাও 
বেশ সময়োপযোগী হয়েছিল, সবাই খুব খুশী হ'ল। 

সে সময়ে ইংরেজ গভর্নমেণ্ট বাংলাদেশকে ছুই ভাগ করবার জন্য 
উঠে পড়ে লেগেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশের মধ্যে 
খুব আন্দোলন সুরু হয়েছে । এতদিন দেশের কথা নিয়ে কিছু মাথ৷ 
ঘামাই নি। মনে পড়ে বছর চার-্পাচ আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় বোয়ার 
যুদ্ধ হয়েছিল । আমর! তখন মনে-প্রাণে ইংরেজ-ভত্ত, ইংরেজের জয় 
শুনলেই খুশী হই। একদিন কাগজে একট! যুদ্ধে ইংরেজের! খুব 
জিতেছে দেখে আমি উৎসাহের সঙ্গে খবরটা সবাইকে শোনাচ্ছি, দাদা 
হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, “নিজের! মার খেয়ে মাটিতে পড়ে আছিস্‌, 
আবার অন্যের মার খাওয়া দেখে হাসছিস ?” ভারি অপ্রস্তুত হয়ে 
গেলাম! 

এবার কিস্ত দেশের প্রতি টানটা মনে মনে বুঝতে পারলাম । 
দেশের সমস্ত লোকের আপত্তি অগ্রান্হ করে জোর করে দেশটাকে 
ছুই ভাগ করে দেওয়! হচ্ছে, এতে দেশের লোকের মনে খুব একটা 


১৩৭ 


আঘাত লাগল । চারদিকে তুমুল আন্দোলন ও উত্তেজনা ৷ রাস্তায় 
রাস্তায় শেভাযাত্র! করে ব্বদেশী গান কীর্তন ; “বন্দে মাতরম্* “সোনার 
বাংলা" “এবার তোর মর! গাঙ্গে বান এসেছে' ইত্যাদি গান ঘরে ঘরে 
সকলের মুখে । বড় বড় সভায় দেশনেতাদের বক্তৃতা, খবরের কাগজে 
এ একই বিষয়ে আলোচনা, লোকের মুখে এ একই কথা । 


তিরিশে আশ্বিন বাংলাদেশকে ছুই ভাগ করা হল। সেদিন 
সারা দেশ জুড়ে হল “রাখী-বন্ধন' । সকাল হ'তে-না-হ'তে দলে দলে 
লোক গান গাইতে গাইতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। সারাদিন ঘুরে 
ঘুরে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরস্পরের হাতে একতা ও মিলনের চিহ্ন রঙ্গীন 
তোর “রাখী' বেঁধে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করল, গভর্নমেন্ট জোর করে 
আমাদের ছুই ভাগ করলেও আমর! কিছুতেই ভিন্ন হব নাঃ মনে প্রাণে 
এক থাকব। বাঙ্গালীর প্রাণ, বাঙ্গালীর মন, বাঙ্গালীর ঘরে যত 
ভাইবোন, এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান 1” 

বিকালে চারিদিক থেকে দলে দলে গান করতে করতে সকলে 
সাকুলার রোডে বিরাট এক জনসভায় এসে মিলল। দেশটাকে 
ছুই খণ্ড করলেও বাঙ্গালী জাতিটা কিছুতেই ছুই ভাগ হবে না, তার 
চিহ্ুত্বরূপ “অখণ্ড-বঙ্গ-ভবন, তৈরী করা হবে, সেই সভায় তার 
“ভিত্তিস্থাপন' হ'ল। ঠিক তার পাশেই আমাদের সেই পুরোনো 
স্কুলের নতুন বাড়ি হয়েছে, আমরা এবং আরে! অনেক মেয়েরা স্কুল- 
বাড়ির বারান্দা ও ছাতে বসে সভা দেখলাম । এত অসংখ্য লোক, 
এমন বিরাট গম্ভীর সভা, আমরা আগে কখনও দেখিনি । 

গভর্নমেণ্টের এই অন্যায় ব্যবস্থার প্রতিবাদে দেশের লোক স্থির 
করল যে, এবার থেকে কেউ বিদেশী জিনিস পারতপক্ষে কিনবে না । 
দেলী জিনিস যতই মোটা বা খারাপ হোক্‌ না কেন, সাধ্যমত তাই 
ব্যবহার করবে । ভাতে একদিকে যেমন দেশী শিল্পের ক্রমে উন্নতি 


১৩৮ 


হবে, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার বিলাভী জিনিস যে আমাদের 
দেশে বিক্রি হয়ে লাভের টাকাটা বিদেশে চলে যায়, সেটাও বন্ধ 
হবে। দেখতে দেখতে স্বদেশী আন্দোলন দেশময় ছড়িয়ে পড়ল । 
শহরে শহরে গ্রামে গ্রামে সমিতি গড়ে উঠল, তারা দেশী জিনিসের 
দোকান করল, তাদের ্বেচ্ছাসেবকরা নিজেরা মোট মাথায় নিয়ে 
গান গেষে ফেরি করতে লাগল--“মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় 
তুলে নে রে ভাই”--যতই মোটা হোক না কেন, লোকে আগ্রহ করে 
তাই কিনতে লাগল। ছেলেরা বিলাতী জিনিসের দোকানের সামনে 
পিকেটিং করে, কাউকে বিলাতী জিনিস কিনতে বা বিলাতী কাপড় 
পরতে দেখলে তার পিছনে লাগে, অতিউৎসাহের চোটে দোকান 
থেকে বিলাতী জিনিস টেনে রাস্তায় ফেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। 
বিলাতী জিনিস বিক্রি একেবারে বন্ধ হবার উপক্রম । 

আমরাও সমস্ত শৌখিন বিদেশী জিনিস ছেড়ে দিয়ে মোটা দেশী 
জিনিস ব্যবহার করতে আরম্ত করলাম । আমাদের মধ্যে মনিরই 
উৎসাহ মবচেষে বেশী। মনি ছিল ভারি গোছালো৷ পরিফার, তার 
পছন্দটাও চমৎকার । সেই আমাদের যত টুকিটাকি জিনিস বেছে 
বেছে স্বন্দর দেখে কিনে এনে দিত । ছেলেবেল৷ থেকেই মনি ছিল 
ভারি পিট্‌পিটে। ধোপছ্ুরস্ত জামাকাপড় নাহলে পরবে নাঃ বাড়িতে 
সাবানকাচ! কাপড় পরাতে গেলে নালিশ করত, “দেখ না, আমাকে 
বাসি কাপড় পরাচ্ছে”» পাশের বাড়ির একটি মেয়ে খেলতে এসেছিল, 
মনি তাকে দেখেই শিউরে উঠল, “না, না, নাঃ ওর সঙ্গে খেলবো না-_ 
এ দেখু, ওর নাক দিয়ে শিকনী পড়ছে ।” ( বেচারার নাকে মস্ত 
একটা মুক্তোর নোলক ছুল্ছিল। ) সেই মনি এখন কোথায় দেশী 
শুতোর মোটা কাপড়, হাতে-তৈরী তুলোট কাগজ, ট্যারা-ব্যাক। 
পেয়ালা-পিরিচ খু'জে-পেতে নিয়ে আসতো । দেশী জিনিস প্রথম 


১৩৯ 


প্রথমে পাওয়াটি নূশকিল হত,যা-ও ব। পাওয়। যেত, ভাও অত্যন্ত মোটা 
অনুষ্র । দাত়্ী তাই ঠা্ী করে গান লিখেছিল : 'দেলী-পাগ.লার 
দল । তার মধ্যে দেশী জিনিসের বর্ণনা ছিল: “দেখতে খারাপ, 
টি'কৃবে কস, দামটা একটু বেলী!” ঠাট্টা করলেও, দাদাও হাসিমুখে 
এ সব মোটা জিনিস ব্যবহার করত। একদিকে যেমন হাসির গান 
লিখেছিল, তেমনি আবার সুন্দর গম্ভীর স্বদেশী গানও লিখেছিল : 
'টুটিল কি আজ ঘুমের ঘোর ? 

এর পরে দাদা একে একে কতকগুলো হাসির নাটক লিখল-_ 
“ঝালা-পালা', “লক্ষণের শক্তিশেল' ইত্যাদি । সেগুলো অভিনয় 
করবার জন্য ভাই-বন্কুদের মধ্যে যাদের অভিনয়ের উৎসাহ আছে 
তাদের নিয়ে নন্সেন্স ক্লাব বলে একটা দল গড়ল। “নন্দেন্স ক্লাব" 
থেকে সাড়ে-বত্রিশ ভাজা নামে একটা হাতে-লেখা কাগজও 
বেরল। এখন যেমন রাজ্জ|য় রাস্ভায় নানান স্বরে শোন৷ যায় “চানাচুর 
গরম !* আমরা ছেলেবেলায় শুনতাম '“সাড়ে-ব-ত্রি-শ ভাজা!” 
বত্রিশ রকমের ভাজাভুজি এবং মশল! নাকি তার মধ্যে থাকত, 
তার উপরে আধখানা ভাজা লঙ্কা বসানো, তাই “সাড়ে-বত্রিশ ! 
কাগজের সম্পাদক দাদা; মলাট ও মজার মজার ছবিগুলো সব দাদার 
আকা, অধিকাংশ লেখাও দাদারই । অন্তাদের লেখাও থাকত, হাসির 
কথ! ছাড়া গম্ভীর বিষয়ে লেখাও থাকত, কিস্তু দাদার লেখাই ছিল 
তার প্রাণ । বিশেষ করে “পঞ্চ-তিত্ত পাঁচন' নামে সম্পাদকের পীচ- 
মিশালী আলোচনার পাতাটি বড়রাও আগ্রহের সঙ্গে পড়তেন ; “পঞ্চ- 
তিক্ত' নাম হ'লেও সেটা কিস্ত মোটেই তেতো ছিল না, বরং খুব 
মুখরোচক ছিল। দাদার ঠাট্রার বিশেষত্বই এই ছিল ষে, তাতে কেউ 
আঘাত পেত না, কারে প্রতি খোঁচা থাকত না, থাকত শুধু মজা, 
শুধু সহজ নির্সস আনন্দ । 


মঙেন্স ক্লাবের অভিনয় এমন চমৎকার হত, যাঁরা নিজের চোখে 
দেখেছে তারাই জানে । মুখে বর্ণনা করে তার বিশ্যেত্ব ঠিক বোঝানো 
যায় না। বাধা স্টেজ নেই, সীন নেই, সাজসজ্জা ও মেকআপ, বিশেষ 
কিছুই নেই, শুধু বথায়, স্বরে ভাবে-ভঙ্গীতেই তাদের অভিনয়ের 
বাহাছ্ুরি ফুটে উঠত। দাদ! নাটক লিখত, অভিনয় শেখাত, আর 
প্রধান পার্টট৷ সাধারণত সে নিজেই নিত। প্রধান' মানে সবচেয়ে 
বোকা আনাড়ির পার্ট! হাদারামের অভিনয় করতে দাদার জুড়ি কেউ 
ছিল না! অন্য অভিনেতাদের মধ্যেও অনেকেরই হাসাবার ক্ষমতা খুব 
ছিল। অভিনয় করতে ওরা নিজেরা যেমন আমোদ পেত, তেমনি 
সবাইকে আমোদে মাতিয়ে তুলত। চারদিকে উচ্ছৃসিত হাসির আোত 
বইয়ে দিতো । ছোট বড় সকলেই সমানে সে আনন্দ উপভোগ করত, 
নন্সেন্স ক্লাবের অভিনয় দেখবার জন্য সকলে উৎন্ক হয়ে থাকত। 
এমনি করে নন্সেন্স ক্লাব বেশ জমে উঠল। ততদিনে আমরাও তো 
আর “ছোট' রইলাম না, স্কুলের পড়া শেষ করে একে একে কলেজের 
দরজায় পৌছলাম । ন্ুৃতরাং ছেলেবেলার গল্প আমার এইখানেই 
ফুরাল। 

কিন্তু, ফুরিয়ে তো যায়নি! তারপরে আরো অর্ধ-শতাব্দী কেটে 
গিয়েছে দের কোলে জন্ম নিলাম, যাদের স্নেহের ছায়ায় বড় হলাম, 
যারা ছিল ছেলেবেলার খেলাধুলা, হাসিকান্না আশা-উদ্ভমের 
নিত্যসাথী, সেই সব মানুষের মধ্যে কতজন আজ কত দূরে চলে 
গিয়েছেন, কিন্তু তাদের সকলের স্মৃতি নিয়ে মনের মধ্যে উজ্জল হয়ে 
রয়েছে ছেলেবেলার সেই মধুর আনন্দময় দিনগুলি ! 


সমাপ্ত 


১৪১ 


৬২৬২৬২৬ ও 
২২২২২২২২ 


২২ 
২১২ 


২২২২ 


ছেলেবেলার দিনগুলি 


২২২২২২২২২২২ 


২৯ ৯ ৯ ২ 
২২ ২২২২২ 


পরিশিষ্ট 


১ম পৃষ্টা ১ম পংক্তি আমাদের বাড়ি : ১৩ কর্মওয়ালিশ স্ট্রীট । সাধারণ ব্রাহ্ম 


১ম পৃষ্ঠ। ৩য় পংক্তি 
১ম পৃষ্ঠ! ৪র্থ পংক্তি 


১ম পৃষ্ঠা ১৬শ পংক্তি 


১ম পৃষ্ঠা ১৬শ পংক্তি 


রথ পৃষ্ঠ! ১০ম পংক্তি 


১৪৩ 


সমাজ-মন্দিরের সামনেই প্রকাণ্ড পুরোনে। বাড়িটি । 
আমাদের স্কুল : ব্রাহ্ম বালিক! শিক্ষালয়। » 
দাদামশাই : নারীকল্যাপ-ব্রতী, স্বদেশে ও সমাজ 
সেবক ৮দ্বারকানাথ গাঙ্ুলী। মাত্র ১৬1১৭ বৎসর 
বয়েসে নিজের গ্রাম ও তার চারপাশে কুলীন মেয়েদের 
খে-ছুর্শা দেখে তিনি আহত বোধ করেন এবং 
তখন থেকেই মনে সংকল্প করেন যে, এদের দুঃখ দূর 
করতে হবে। সারাজীবন তিনি স্ত্রীশিক্ষা-বিস্তার ও 
সমাজসংস্কারের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। 

বাবা : লন্বপ্রতিষ্ঠ শিল্পী, সাহিত্যিক ও কলাবিদ্‌ 
৬উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী । বাংলার শিশুসাহিত্য 
রচনায় তিনি একজন অগ্রণী ছিলেন। ভার মরস 
সরল সুমধুর তাষায় লেখ! বইগুলি ও তার আকা 
মনোহর কৌতুককর ছবিগুলি আমাদের শিশুসাহিত্যের 
মহামূল্য সম্পদ । ভারতবর্ষে উচ্চশ্রেণীর ছবি তৈরী 
ও মুদ্রণে তিনি যে শুধু পথপ্রদর্শক ছিলেন তা' নয়-- 
এক্ষেত্রে তীর মৌলিক গবেষণা ও আবিষ্কারের মুল্য 
ইংলণ্ড ও আমেরিকার চিন্রমুস্ত্রণশিল্পী-মহলে মুক্তকণ্ঠে 
স্বীকৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। 

মা: ৮৬দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর জ্যেষ্ঠ কন্ঠ], ৮বিধুমুখী 
রায়চৌধুরী | 

দিদিমা : ভারতের প্রথম মহিলা-গ্র্যাছুয়েট্‌, ডাক্তার 
৮/কাদস্থিনী গাঙ্গুলী । 


ধর্থ পৃষ্ঠ! ১৩শ পংক্তি জংনুমাম! : ৬ঘ্বারকানাধ গাঙ্থুলীর চতুর্থ পু, মুলেখক 
ও নুবক্তা প্রভাতচন্ত্র গাঙ্গুলী । 

৬ পৃষ্ঠা ৫ম পংক্তি চামিমাসী : ৮ঘ্বারকানাথ গাঙ্থুলীর তৃতীয় কন্তা, দেশ 

সেবিকা ৬জ্যোতিরময়ী গাঙ্গুলী (ডাকনাম : চামেলী )। 

ইনি কলকাত।, জলম্বর, সিংহল প্রস্ৃতি নান! জায়গায় 

মহিলা-কলেজের ও নারীকল্যাশ-প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষতা 

করেছিলেন। দেশসেবার কাজে যোগ দিয়ে তিনি 

কারাবরণ ও অনেক ত্যাগশ্থীকার করেছিলেন। 

৭ম পৃষ্ঠা ১ম পংক্তি দিদি: বাংলার শিশুসাহিত্যে সুপরিচিত! সুলেখিক! 
শ্রীযুক্ত সুখলতা৷ রাও। 


৭ম পৃষ্ঠা ৮ম পংক্তি দাদ! : ৬ন্ুকুমার রায়, ধার অপূর্ব হাসির লেখা ও 
ছবি বাংলার ছেলেমেয়েদের প্রাণে নির্মল আনন্দের উৎস 
খুলে দিয়েছে। অসামান্ত প্রতিভ! নিয়ে তিনি 
জন্মেছিলেন, নানাদিকে সে প্রতিভার পূর্ণ বিকাশের 
আরস্ভেই অকালে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন । এই 
অল্লকালের মধ্যেই তিনি শিগুসাহিত্যে যে দান রেখে 
গিষেছেন, তার তৃলন! নেই। 

৯ম পৃষ্ঠা ১ম পংক্তি সুরমায়াসী : স্থুরম! ভট্টাচার্ষ, পরে প্রমদারঞ্জন রায়ের 
(ছোটকাক1) সজে এর বিবাহ হয়। এ'দেব কন্ত। 
শরমতী লীল! মজুমদারের নাম কে না! জানে? 

৯ম পৃষ্ঠা ৯ম পংক্তি সুরমামাসীর বাবা : ৮রামকুমার ( ভট্টাচার্য ) বিদ্যারত্ব 
( পরে রামানন্দ ত্বামী )। 

১ম পৃষ্ঠ! ২৩শ পংক্তি ুন্দরকাকা: বিষ্তাসাগর কলেজের ভূতপূর্ব অধ্যাপক 
৮মুক্তিদারঞ্জন রায়। ইনি তাল ক্রিকেট খেলোয়াড় 
ছিলেন। 

১১শ পৃষ্ঠ! ৪র্থ পংকি ভুলুমাম! : ৬দ্বারকানাথ গাঙ্ুলীর পুত্র ৮নির্মলচন্ত্র । 

১১শ পৃষ্ঠা ১২শ পংক্তি মংলুমামা : ৬ম্বারকানাথ গাঙ্গুলীর পুর ৬প্রসুল্চন্তর ৷ 


১৪৪ 


৯২শ পৃষ্ঠা ৯ম পংক্ি ছোটকাক। : ৮প্রমদারঞ্জন রায়। ইনি প্সার্ডে অত 
ইত্ডিয়া” বিভাগে কাজ করতেন, সেই উপলক্ষ্যে 
ভাকে বর্মা ও সীমাস্তপ্রদেশের ছুর্গম ও বিপদসন্কুল 
গতীর বনজঙ্গলে পাহাডে ঘুরতে হ'ত, সেই সব 
রোমাঞ্চকর কাহিনী তার প্বনের খবর” বইয়ে অতি 
সুন্দর চিত্তাকর্ষক ভাষায় তি।ন বর্ণনা করেছেন। 


্ ১২২১১১২১২১২